গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থার ওপর ফেডারেল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন অন্তত আট অঙ্গরাজ্যে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
তদন্ত পরিচালনা, অভিযান এবং ব্যালট ব্যবস্থাপনা ও ভোটার পরিচয় সংক্রান্ত তথ্যে প্রবেশাধিকারের দাবির মাধ্যমে এই তৎপরতা চালানো হচ্ছে। অথচ ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন পরিচালনা স্থানীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওহাইওর ফ্র্যাংকলিন কাউন্টি নির্বাচন বোর্ডে একটি অপ্রত্যাশিত ফোন আসে। পরিচয় দেওয়া হয় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) একজন এজেন্ট হিসেবে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ভোটার রেকর্ডে প্রবেশাধিকার চান।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোয় এই দাবি আরও বাড়তে থাকে। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা ই-মেইল অনুযায়ী, এজেন্টটি ডজনখানেক ভোটারের নিবন্ধন ফর্ম ও ভোটের ইতিহাস চেয়ে পাঠান, যেসব তথ্যের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর ও অন্যান্য গোপনীয় তথ্য ছিল। তিনি স্থানীয় ভোটার নিবন্ধন সংগঠন সম্পর্কেও তথ্য চান এবং বিষয়টিকে “তদন্তের অংশ” ও “অত্যন্ত জরুরি” বলে উল্লেখ করেন। তবে তদন্তের কারণ বা লক্ষ্য সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ফ্র্যাংকলিন কাউন্টির নির্বাচন পরিচালক অ্যান্টোনি হোয়াইট বলেন, “আমরা এর আগে কখনো হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কাছ থেকে ফোন পাইনি, তাই বিষয়টি অস্বাভাবিক ছিল।” তিনি জানান, তিনি তথ্য দিয়েছেন, কিন্তু এখনো জানেন না এই তদন্তের উদ্দেশ্য কী ছিল। ডিএইচএস বলেছে, তারা “যেখানেই নির্বাচনী জালিয়াতির সন্ধান পাওয়া যাবে, সেখানেই সক্রিয়ভাবে তদন্ত করবে।”
রয়টার্সের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওহাইওতে অন্তত ছয়টি কাউন্টিতে ভোটার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। নেভাদায় এফবিআই ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে সেক্রেটারি অব স্টেটের দপ্তরে ভোটার তথ্য চায়। কলোরাডোয় ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ সাইবার নিরাপত্তা কর্মকর্তা ভোটিং মেশিনে প্রবেশাধিকার চেয়েছেন বলে স্থানীয় এক ক্লার্ক জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে কলোরাডোর অন্তত ৬৩টি কাউন্টির ক্লার্ক ফেডারেল সমন বা নির্বাচন কেন্দ্রে ফেডারেল এজেন্টের উপস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় ৪০টির বেশি কাউন্টির কর্মকর্তারা সশস্ত্র ফেডারেল কর্মকর্তাদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতিসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে একটি সারা দিনের কর্মশালায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের ওপর ফেডারেল কর্তৃত্ব বিস্তারের ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যেই বলে আসছেন। এ বছর অন্তত ১৫টি বক্তব্যে তিনি তাঁর দলকে ভোটিং “দখল” ও “জাতীয়করণ” করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নির্বাহী আদেশ ও প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ভোট দিতে নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা, ফেডারেল সংস্থাকে ভোটার তালিকা সংকলনের অনুমতি দেওয়া এবং যোগ্যতা যাচাইয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ডেটাবেজ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিশ্চিত করতে চান যে ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত এবং অনিবন্ধিত বিদেশি নাগরিকদের থেকে রক্ষিত।”
মিনেসোটার সেক্রেটারি অব স্টেট স্টিভ সাইমন বলেন, রাজ্যগুলোকে এখন এই সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে যে “আমাদের নিজস্ব ফেডারেল সরকার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে।” তিনি বলেন, “বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনা না করা, ফেডারেল হস্তক্ষেপ কেমন হতে পারে তা নিয়ে চিন্তা না করাটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হবে।”
নেভাদার ডগলাস কাউন্টির রিপাবলিকান ক্লার্ক অ্যামি বার্গানস বলেন, “এখানে একটা ভয়ের বিষয় আছে।” তিনি বলেন, উচ্চমাত্রার ফেডারেল তৎপরতা নির্বাচন কর্মকর্তাদের মনে প্রশ্ন জাগাচ্ছে— “পরবর্তীতে কে?”
ইউসিএলএর নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ রিচার্ড হেজেন বলেন, নির্বাচন কয়েকটি জেলায় নির্ধারিত হলে “সেসব এলাকায় ফল পরিবর্তনের চেষ্টা বেশি হতে পারে।”
ডিএইচএসের মধ্যে একটি নতুন “নির্বাচন অখণ্ডতা” দপ্তর তৈরি করা হয়েছে এবং নির্বাচনী জালিয়াতির ভিত্তিহীন দাবির প্রচারকারী হিদার হানিকে এর প্রধান করা হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নির্বাচন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সির (সিআইএসএ) বাজেট ও জনবল ছাঁটাই করা হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রশাসনের কৌশল একটি সরাসরি “দখলের” বদলে ভোটার তালিকা যাচাই, ভোটিং মেশিনে প্রবেশাধিকার এবং জালিয়াতির প্রমাণ খোঁজার নামে একাধিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে কঠোর নিয়ম আরোপ বা ঘনিষ্ঠ ভোটের ফল বিতর্কিত করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।