রয়টার্স
গত ৭ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হুঁশিয়ারি দেন, “আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা মরতে পারে।” বার্তাটি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত এক ইউরোপীয় কূটনীতিক তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে ছুটে যান — ট্রাম্প কি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবছেন?
কিন্তু পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া উত্তর ছিল উদ্বেগজনক: তাঁরা নিজেরাও জানেন না ট্রাম্প কী বোঝাতে চেয়েছিলেন।
এই ঘটনা আমেরিকার কূটনৈতিক কাঠামোর গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। রয়টার্সের তদন্তি প্রতিবেদনে ৫০-এরও বেশি জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক, হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা এবং অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র।
বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৫টি রাষ্ট্রদূত পদের মধ্যে এখন ১০৯টিই শূন্য। ইরানের সীমান্তবর্তী সাতটি দেশের পাঁচটিতে এবং উপসাগরীয় ছয় রাষ্ট্রের চারটিতে কোনো মার্কিন রাষ্ট্রদূত নেই। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলার সময়েও এই শূন্যতা পূরণ হয়নি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলান বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকার বিশ্বকে বোঝার সক্ষমতাকে ক্ষয় করছে। তিনি বলেন, “আমরা আর আগের মতো কূটনীতি ব্যবহার করতে পারব না — সম্পর্ক গড়তে, চুক্তি করতে, যুদ্ধ এড়াতে বা থামাতে।”
গত বছর পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রায় তিন হাজার কর্মী চলে গেছেন — অর্ধেককে বরখাস্ত করা হয়েছে, বাকিরা স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে ক্যারিয়ার কূটনীতিকরা ৫৭ থেকে ৭৪ শতাংশ রাষ্ট্রদূত পদে থাকতেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তা নেমে এসেছে মাত্র ৯ শতাংশে।
পরিস্থিতি সামলাতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এখন সরকারি চ্যানেলের বদলে সরাসরি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে যোগাযোগ করছে।
সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার — যাঁর কোনো সরকারি পদ নেই — এবং তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী স্টিভ উইটকফ, যাঁর কোনো কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই। ইউক্রেন, গাজা ও ইরান নিয়ে আলোচনায় এই দুজনই এখন মার্কিন প্রধান আলোচক।
দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন বাণিজ্য আলোচকদের পাশ কাটিয়ে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। জাপান খুঁজে নিয়েছে আরও অভিনব পথ — সফটব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মাসাযোশি সন, যিনি ট্রাম্পের গলফ সঙ্গী, তাঁকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করছে টোকিও।
ইরানের সঙ্গে জেনেভায় পরমাণু আলোচনায় মার্কিন দলের দক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। একজন জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কূটনীতিক জানান, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিভিন্ন মাত্রার পার্থক্য এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মৌলিক বিষয়গুলো বোঝাতে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদেরই ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে মার্কিন দলকে।
আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের কেলসি ডেভেনপোর্ট বলেন, উইটকফের বক্তব্যে বহু ভুল ছিল, যা “কারিগরি অদক্ষতা”র প্রমাণ। তিনি বলেন, “উইটকফকে পরমাণু বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। কিন্তু তা না হলে তাঁকে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ঘিরে রাখতে হবে।”
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন অন্তত আধ ডজন ইরান পরমাণু বিশেষজ্ঞকে ছাঁটাই করেছিল।
কিয়েভে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রিজেট ব্রিংক ২০২৫ সালের মার্চে সামরিক সহায়তা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানান। তাঁর দূতাবাসে ছিলেন এক হাজার বেসামরিক কর্মকর্তা, যাঁরা ইউক্রেনীয় বাহিনীর সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
তিনি বলেন, “কেন সহায়তা বন্ধ হলো, সেটা জানতে চাইলে কোনো উত্তর পাইনি।” পেন্টাগন, পররাষ্ট্র দপ্তর, হোয়াইট হাউস — সবখানে যোগাযোগ করেছিলেন তিনি।
ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এনএসএক) সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে বলা হয় “শুধু ফোন করুন।” ব্রিংক এই ব্যবস্থাকে “অকার্যকর” বলে অভিহিত করেন এবং ইউক্রেনে ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এপ্রিল ২০২৫-এ পদত্যাগ করেন।
ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি একটি কড়া যৌথ বিবৃতি তৈরি করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা প্রকাশ করেনি। এক ইউরোপীয় কূটনীতিক জানান, তাঁরা মনে করেছিলেন ট্রাম্পের ভাষা নিছক “হুমকি”, এবং প্রকাশ্যে সমালোচনা হলে তিনি আরও বেশি বোমা হামলায় উৎসাহিত হতে পারেন। সেদিন সন্ধ্যায়ই ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।
তবে কূটনীতিকরা সতর্ক করেছেন, বারবার ট্রাম্পের হুমকিকে “ফাঁকা বুলি” বলে উড়িয়ে দেওয়া বিপজ্জনক — পরের কোনো সংকটে এতে প্রস্তুতির ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ব্রায়ান নিকোলস বলেন, “এক হাত বাঁধা রেখে আমরা কূটনীতি করে যাচ্ছি।”