নিজস্ব সংবাদদাতা
উপজেলা পর্যায়ের স্পর্শকাতর দপ্তরগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কালীগঞ্জ ভূমি অফিস তথা এসিল্যান্ড অফিস। সরকারি ও জনসাধারণের জমিজমা-সংক্রান্ত সমস্ত রেকর্ডপত্র ও অতি গুরুত্বপূর্ণ নথি এখানে সংরক্ষিত থাকে। এ কারণে এই অফিসের নিরাপত্তা সর্বদাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। পুরো অফিস পর্যবেক্ষণের জন্য চারদিকে আটটি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা রয়েছে এবং রাতে পাহারার জন্য নিয়োজিত রয়েছেন একজন নৈশপ্রহরী। এত নিরাপত্তাব্যবস্থার পরেও কালীগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসে গত ১৯ মে রাতে অফিস বন্ধের মাত্র ১৮ মিনিটের মধ্যে জানালার গ্রিল কেটে লুটের ঘটনা ঘটেছে।
কিন্তু ঘটনার একদিন পর থানায় মামলার পরিবর্তে স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ চুরি হয়েছে জানিয়ে কেবল লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন অফিসের নাজির মোঃ আল আমিন। কেন সরাসরি মামলা করা হয়নি, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এ ঘটনায় অফিসের নাজির মো. আল আমিনের দাবি, তার স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ চুরি হয়েছে। চুরি হওয়া জিনিসপত্র সরকারি না, তার নিজস্ব। তাই তিনি বাদি হয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন।
তবে ঘটনার রহস্যময় ধরন ও একাধিক অস্বাভাবিক দিক নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে রাত আনুমানিক ৮টা ২০ মিনিটে তিনি অফিসের পশ্চিম পাশের দ্বিতীয় কক্ষে স্টিলের আলমারির ড্রয়ারে রাখা স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ যথাস্থানে আছে কিনা দেখে তালা লাগিয়ে অফিস ত্যাগ করেন আল আমিন। পরদিন ২০ মে সকাল সাড়ে আটটায় অফিসে এসে তিনি দেখতে পান, আলমারি ও ড্রয়ারের তালা ভাঙা এবং রক্ষিত স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ নেই। এ ছাড়া অফিসের দক্ষিণ পাশের জানালার গ্রিল কাটা এবং পেছনের সিসি ক্যামেরা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়।
পরে সিসি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯ মে রাত ৮টা ৩৮ মিনিটে মুখে গামছা বাঁধা এক অজ্ঞাত ব্যক্তি পেছনের ক্যামেরা ভেঙে দেয়। এরপর জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে আলমারি ও ড্রয়ারের তালা ভেঙে সব নিয়ে চলে যায়।
অর্থাৎ আল আমিন অফিস ছাড়ার মাত্র ১৮ মিনিটের মাথায় এই ঘটনা ঘটে।
বিধি অনুযায়ী সরকারি অফিসে, বিশেষত ভূমি অফিসে, নগদ লেনদেনের সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বর্ণালঙ্কার সেখানে থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
এ বিষয়ে আল আমিন জানান, পারিবারিক সমস্যার কারণে ঘটনার তিন দিন আগে তিনি তার স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ অফিসে এনে আলমারির ড্রয়ারে রেখেছিলেন।
অভিযোগে লুট হওয়া মালামালের বিবরণ দেওয়া হয়েছে এভাবে, ১ ভরি ৮ আনা ওজনের স্বর্ণের গলার হার, ১ ভরি ওজনের গলার চেইন এবং ৮ আনা ওজনের ৪টি আংটি, যার মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া নগদ ৫০ হাজার টাকা।
আল আমিন বলেন, অফিসে তিনটি ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও অন্যান্য সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলো কিছুই নেওয়া হয়নি। কেবল তার ড্রয়ারে রাখা জিনিসপত্রই চুরি হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও ঘটনা পর্যালোচনায় একাধিক অস্বাভাবিক বিষয় সামনে এসেছে।
প্রথমত, যে দিন এ ঘটনা ঘটেছে, সেদিন অর্থাৎ ১৯ মে ভূমি অফিসেই ‘ভূমি মেলা-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। দিনভর কর্মব্যস্ততার পর অফিস বন্ধ হতেই ঘটনা ঘটে।
দ্বিতীয়ত, সুনির্দিষ্টভাবে কেবল আল আমিনের ড্রয়ার টার্গেট করা হয়েছে। অফিসের অন্য কোনো ড্রয়ার, কম্পিউটার বা নথিপত্র স্পর্শ করা হয়নি। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, দুর্বৃত্তরা আগে থেকেই জানত কোথায় কী আছে।
তৃতীয়ত, ঘটনার সময় বিদ্যুৎ ছিল না। ফলে সিসি ক্যামেরায় দুর্বৃত্তের চেহারা স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি।
চতুর্থত, সে সময় নৈশপ্রহরী শহীদুল্লাহ নামাজে ছিলেন। ঠিক সেই ফাঁকেই ঘটনাটি ঘটে।
এসব বিষয় বিশ্লেষণ এবং তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আল আমিনের ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কেউ বা তার সঙ্গে বিরোধ রয়েছে এমন কেউ এই ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। আবার আরেকটি সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্তকারীরা। ভূমি অফিসে অনেক সময়ই নানা অনিয়মের পথে অবৈধ অর্থ আদান-প্রদান হয়। সেই অর্থ ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকেও এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব — যাতে একজন সব টাকা হাতিয়ে নিয়ে ‘লুট হয়েছে’ বলে পার পেয়ে যেতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কালীগঞ্জ ভূমি অফিসে অন্ততঃ চার বছর আগে মিউটেশন কাম-সার্টিফিকেট সহকারী হিসেবে আল আমিন যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি নাজির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে ‘হৃদয়’ নামের স্থানীয় এক যুবক বিগত তিন থেকে চার বছর ধরে কাজ করে আসছেন। তিনি সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নন। তবে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় নথিপত্র অবাধে দেখা ও ব্যবহারের অঘোষিত সুবিধা ভোগ করে আসছেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, হৃদয় নামজারি অনুমোদন করিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেন। এমনকি এসিল্যান্ড ও আল আমিনের নাম ভাঙিয়ে এই অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। তাকে অনেকেই আল আমিনের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেই চেনেন।
মাঝে কিছু দিন অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হলেও এখন তিনি আবার নিয়মিত অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
আল আমিন জানান, কালীগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের পাশের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় তিনি পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিন, অর্থাৎ গত ১১ ফেব্রুয়ারি, নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে গেলে ফাঁকা বাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পরিবারের সদস্যরা বেড়াতে যাওয়ায় স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ নিরাপদ ভেবে অফিসে এনে রেখেছিলেন তিনি।
সামগ্রিক বিশ্লেষণে প্রশ্ন উঠছে — সরকারি ভূমি অফিসে এত নিরাপত্তাব্যবস্থার পরেও মাত্র ১৮ মিনিটে এত পরিকল্পিতভাবে কীভাবে ঘটনাটি ঘটল? আল আমিনের ড্রয়ারে মূল্যবান সম্পদ রয়েছে — এই তথ্য দুর্বৃত্তরা কীভাবে জানল? বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও নৈশপ্রহরীর অনুপস্থিতির সুযোগটি কি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো স্পষ্ট হবে এই রহস্যময় লুটের নেপথ্যের সত্যিকারের চিত্র। এ বিষয়ে পুলিশের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, ঘটনার পর থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।