সিএনএন
ইরান দ্রুত তার ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো পুনরায় চালু করছে। বুলডোজার আর ডাম্প ট্রাক দিয়ে মাটি সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোটি কোটি ডলারের হামলার ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছে তেহরান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ধ্বংস করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নষ্ট করা যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর প্রবেশপথ ধ্বংস এবং সংযোগ সড়ক বোমা মেরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সিএনএনের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সাধারণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইরান সেই ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে নিচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় মোট ৬৯টি সুড়ঙ্গ প্রবেশপথে হামলা চালানো হয়েছিল। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৫০টি পুনরায় খুলে ফেলা হয়েছে। বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোও মেরামত করা হয়েছে এবং দুটি স্থানে রাস্তা নতুন করে পাকা করা হয়েছে।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষণা সহযোগী স্যাম লেয়ার বলেন, ইরানের কাছে এখনো বিপুল মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘লঞ্চার ও দল যত দিন থাকবে, উৎপাদন বন্ধ হলেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারবে। ভূগর্ভে মজুত বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার থেকে তাদের ঠেকানোর কিছু নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৌশলগত সাফল্য পাওয়া গেলেও যদি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধলক্ষ্য এবং বিজয়ের কার্যকর পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে তা কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হতে পারে।’
হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও নিরাপত্তা গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক তিমুর কাদিশেভ বলেন, ‘ইরান ২০ বছর ধরে এই ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা অত্যন্ত প্রস্তুত।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষতি করতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও উন্নত অস্ত্র লাগছে, আর পুনরুদ্ধার হচ্ছে একেবারে সাধারণ প্রযুক্তি দিয়ে — শুধু বুলডোজার।’
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোতে এখনো প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। কোনো কোনো ঘাঁটি শতাধিক মিটার পাথরের নিচে থাকায় সেগুলোতে সরাসরি আঘাত করা কঠিন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রবেশপথ ধ্বংসের কৌশল নিয়েছিল। তবে ভূগর্ভের মজুত সেই স্থলভাগের হামলায় তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইসফাহানের বাইরে একটি ঘাঁটিতে মাত্র দুটি প্রবেশপথ বন্ধ রাখতে অন্তত ১৮টি বোমা হামলা চালাতে হয়েছে। অথচ মে মাসের শুরুতেই একটি ডাম্প ট্রাক দিয়ে সেই গর্ত ভরাট করা হয়।
খোমেইনের কাছে একটি ঘাঁটিতে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে একটি প্রবেশপথ পুনরায় খুলতে একসঙ্গে অন্তত ১০টি নির্মাণ যান কাজ করতে দেখা গেছে।
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পুনরুদ্ধারের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যুদ্ধবিরতির সময় দাবি করেছিলেন, ইরানের ‘কোনো প্রতিরক্ষা শিল্প নেই’। তবে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, ইরান ইতিমধ্যে ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ও উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, ‘পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইরান গোয়েন্দা সংস্থার সব সময়সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’
বিশ্লেষকরা উদ্বেগ জানাচ্ছেন যে ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের ক্রমাগত হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। বিশেষত, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার সংখ্যাও কমে আসছে।
প্রসঙ্গত, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে। তবে বিস্তারিত চুক্তি সম্পন্ন হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।