পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম বাংলাদেশিদের বিতাড়ন, বাড়ছে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা

'চিহ্নিত করো, মুছে ফেলো, বহিষ্কার করো' নীতিতে শত শত অভিবাসীকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে; আটক করা হচ্ছে বন্দিশিবিরে

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম বাংলাদেশিদের বিতাড়ন, বাড়ছে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা

আল জাজিরা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর সীমান্তচৌকির কাছে কাঁচা ইট-সিমেন্টে নির্মিত একটি অসম্পূর্ণ ভবনে বসে আছেন রাইসুল ইসলামের স্ত্রী রেবেকা খাতুন (৩৬) এবং তাঁদের দুই ছেলে রিয়াদ (১৪) ও জুবায়ের (১৬)। তীব্র গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে বিশুদ্ধ পানির অভাবে ঘরটি যেন একটি চুল্লিতে পরিণত হয়েছে।

ভবনে গাদাগাদি করে থাকা এই মানুষগুলো বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম অভিবাসী। নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পরিচালিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ‘চিহ্নিত করো, মুছে ফেলো, বহিষ্কার করো’ নীতির আওতায় এদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে সীমান্ত গ্রামে নিয়ে আসা হয়েছে।

বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম (৩৮) জানান, স্ত্রীর চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য দুই বছর আগে তিনি পরিবার নিয়ে ভারতে এসেছিলেন। বাংলাদেশের তুলনায় বেশি মজুরি পেয়ে সেখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রায় আড়াই লাখ টাকা দালালকে দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় এসে দম্পতি রাজমিস্ত্রির কাজে দিনে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা আয় করতেন।

কিন্তু গত মাসের শেষ দিকে মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারীর বহিষ্কার আদেশের পর সব বদলে যায়। বিজেপি এই অভিযানে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, কেবল মুসলিম বাংলাদেশিরাই বহিষ্কারের লক্ষ্য — হিন্দু ও অন্য ধর্মের অভিবাসীরা বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় ছাড় পাবেন।

রাইসুল ইসলাম জানান, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের হয়রানির আশঙ্কায় তাঁরা স্বেচ্ছায় সীমান্তচৌকিতে আত্মসমর্পণ করেছেন।

আরেক অভিবাসী মিরাজুল গাজী (৪২) জানান, পাঁচ বছর ধরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কলকাতায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাড়িওয়ালা বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেন এবং স্থানীয়দের হামলার ভয়ে তিনিও ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে হাকিমপুর সীমান্তচৌকিতে মে মাসের শেষ থেকে নিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের আনা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানান, প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ জন অভিবাসী আসছেন, যাঁদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পাশাপাশি বায়োমেট্রিক তথ্যও নেওয়া হচ্ছে।

রোববার কলকাতায় সাংবাদিকদের কাছে মুখ্যমন্ত্রী অধিকারী জানান, এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং রাজ্যের সব জেলায় আটক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। আরও ৮৩৬ জন বর্তমানে আটক কেন্দ্রে রয়েছেন এবং শিগগিরই তাঁদেরও বহিষ্কার করা হবে বলে তিনি জানান।

২০২৪ সালে বাংলাদেশে যুব-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। হাসিনার ভারতে আশ্রয় এবং তাঁকে প্রত্যর্পণে নয়াদিল্লির অস্বীকৃতি সম্পর্কটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের অভিযান নতুন কূটনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবায়েদ জানান, এ বিষয়ে নয়াদিল্লিকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং অভিবাসীদের জাতীয়তা যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি মানার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, ৪ জুনের পর থেকে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) অন্তত ১৮টি পুশ-ইনের চেষ্টা করেছে, যাতে প্রায় ১৮০ জনকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সোমবার থেকে দুই বাহিনীর মধ্যে তিন দিনের বৈঠক শুরু হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশি সন্দেহভাজন ২ হাজার ৮০০-এরও বেশি ব্যক্তির তথ্য জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, যার অনেকগুলো এখনো অনিষ্পন্ন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক ইলেইন পিয়ার্সন এই বহিষ্কারকে ‘বেআইনি’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও আটকদের আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে কোনো ভারতীয় নাগরিক ভুলবশত বহিষ্কৃত না হন।

পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ মুসলিম। মূলত মুসলিম বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে পরিচালিত এই অভিযান রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। এর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

মানবাধিকার কর্মী তিস্তা শেতলওয়াদ অভিযোগ করেছেন, পুলিশ এলোপাতাড়িভাবে মানুষ তুলে আটক কেন্দ্রে পুরছে এবং ‘পণ্যের মতো’ সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে।

সন্ধ্যায় নারকেলগাছের আড়ালে সূর্য ডুবে যেতে যেতে রাইসুল ইসলাম দুই ছেলেকে কাছে টেনে চোখের জল মোছেন।

“ছেলেদের ভালো জীবন দিতে এখানে এসেছিলাম। অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু অনবরত তাড়া ও অপমানে আমরা তিক্ত স্মৃতি নিয়ে ফিরে যাচ্ছি,” — বলেন তিনি।

কিছুক্ষণ পরই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পরিবারটিকে একটি গাড়িতে তুলে ১৮ কিলোমিটার দূরের আটক কেন্দ্রে নিয়ে যান।

সূত্র: আল জাজিরা