বিশেষ প্রতিনিধি
গাজীপুরে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের একের পর এক ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় পুলিশ ও বিএনপির স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে নির্লিপ্ততা ও যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, মিছিল করছেন এবং অর্থায়ন করছেন, অথচ পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না।
সোমবার (২৭ জুলাই) গাজীপুর মহানগরীর বরকত সরণীতে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব অভিযোগ করেন।
গত সংসদ নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে গাজীপুর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আলী নাসের খান বলেন, ‘দেশের জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে গাজীপুরকে ফ্যাসিস্টমুক্ত করেছে। অথচ এখন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতারা প্রকাশ্যে মিছিল করছে। পুলিশ আগে থেকেই তথ্য পেয়েও এসব মিছিল ঠেকাতে পারছে না।’
গাজীপুরে সাম্প্রতিক কয়েকটি মিছিলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২১ মে গাছা থানায় যুবলীগের মিছিল থেকে পুলিশকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ২১ জুন বাসন থানায় মহানগর ছাত্রলীগ, ৩ জুলাই রাজেন্দ্রপুরে ছাত্রলীগ, ১৬ জুলাই বাসন থানায় ছাত্রলীগ এবং সর্বশেষ ২৬ জুলাই গাছা এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছে। এসব মিছিলের সময় পুলিশকে আগেই অবহিত করা হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আলী নাসের খান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের এসব মিছিলের বিষয়ে জেলা পুলিশ ও মহানগর পুলিশকে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়েছে। ওসিরা মিছিলের সময় জানতেন। তারপরও তারা কীভাবে মিছিল প্রতিহত করতে পারলেন না এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সংগঠকদের গ্রেপ্তার করলেন না, এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।’
আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহিমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আব্দুর রহিম আওয়ামী লীগের অর্থদাতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। পুলিশ তাকে দুই দফা গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে সিআর ও জিআর মামলা রয়েছে। কিন্তু ‘ওপর মহল’ থেকে ফোন আসার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপির বড় নেতাদের ফোনের পর তাকে ছাড়ার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। গত পরশুও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করার পর ছেড়ে দেয় বলে জানান তিনি।
‘আমরা প্রতিটি ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে পুলিশ ও বিএনপির একটি আঁতাত দেখতে পাচ্ছি’, বলেন তিনি।
ওলামা লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি পরিচয় দেওয়া মাওলানা ইসমাইলের প্রসঙ্গ টেনে আলী নাসের খান বলেন, হত্যা, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন মামলার আসামি এবং চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত এই নেতা গাজীপুর মহানগরের সাতাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করছে না। তার অভিযোগ, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিলে এই ব্যক্তি অর্থায়ন করছেন।
গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান ও গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চুরও আওয়ামী লীগের মিছিলের বিষয়ে নীরবতার জন্য সমালোচনা করেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, ‘গাজীপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের মিছিলের ব্যাপারে সংসদ সদস্যদের কোনো বক্তব্য আমরা দেখতে পাইনি। মুজিবুর রহমান ও ডা. বাচ্চুর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তার বিষয়ে তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করা উচিত।’
গাজীপুর মহানগর বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকর্মীদের যোগসাজশের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, পতিত আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিংয়ে অনেকে মদদ ও অর্থায়ন করছেন। আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাদের পুনর্বাসনের সঙ্গে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের একটি অংশ এবং পুলিশের যোগসাজশ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে আলী নাসের খান বলেন, পুলিশ আওয়ামী লীগের নেতাদের আগাম তথ্য দিচ্ছে এবং তাদের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছে। পুলিশের ফ্যাসিবাদী চরিত্র এখনো বদলায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতারা সীমান্তবর্তী এলাকায় এসে মিছিল করে আবার নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছেন। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী আগেভাগে তথ্য পেলেও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতারা কীভাবে গাজীপুরে এসে মিছিল করে আবার চলে যাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আলী নাসের খান অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ‘জনগণকে আবার হাসিনা আমলের মতো ভয় দেখানো হচ্ছে, তোমরা যদি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলো, বিচার ও সংস্কারের দাবি করো, তাহলে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করা হবে।’
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার, তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন তিনি।
গাজীপুরে একের পর এক নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে জেলার পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার এবং বাসন, গাছাসহ সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও এসআইদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান আলী নাসের খান। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমল থেকে এখনো গাজীপুরে কর্মরত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি করে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গঠন এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুর মহানগর যুবশক্তির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম তারেক, জাতীয় কৃষকশক্তির কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান খোকন, মহানগর যুবশক্তির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাশেম মাস্টার, গাছা থানা যুবশক্তির আহ্বায়ক আবু বকর সিদ্দিকসহ দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।