গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
একটি ছোট্ট শর্ত বদলে দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে কে যেতে পারবেন, আর কে পারবেন না— তার পুরো হিসাব। উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে ন্যূনতম দুই বছর কাটানোর নতুন বাধ্যবাধকতা কার্যত ঠিক করে দিচ্ছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হওয়ার দৌড়ে কারা টিকে থাকবেন।
হিসাবটা এমন দাঁড়াচ্ছে— আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব কর্মকর্তা ডিএমডি পদে উন্নীত হয়েছিলেন, নতুন শর্তে তারাই এখন এগিয়ে। আর সরকার পতনের পর যারা ডিএমডি হয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতার মেয়াদ এখনো দুই বছর পূর্ণ হয়নি বলে তারা মূল প্রতিযোগিতা থেকেই বাদ পড়ে যাচ্ছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই মুহূর্তে নতুন এমডি খোঁজার কাজে হাত দিয়েছে। শর্ত পূরণ করা ১৯ জন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও তৈরি হয়ে গেছে। এই তালিকা ধরেই সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের পাশাপাশি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে নতুন নেতৃত্ব বসানো হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে।
এই বাধ্যবাধকতার উৎস চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি জারি হওয়া একটি নীতিমালা। তাতে বলা হয়, এমডি পদে পদোন্নতি পেতে হলে প্রার্থীর নবম গ্রেড থেকে অন্তত ২০ বছরের চাকরিজীবন থাকতে হবে, এবং তার মধ্যে ডিএমডি হিসেবে কমপক্ষে দুই বছর কাটাতে হবে। আগে এই দুই বছরের শর্তটি ছিলই না— অর্থাৎ ডিএমডি হওয়ার পরপরই এমডি পদের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ ছিল।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে নীতিমালায় এই পরিবর্তন আনাটা কাকতালীয় নয় বলেই তাদের সন্দেহ। যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, অতীতে যারা রাজনৈতিক বিবেচনায় তাড়াতাড়ি পদোন্নতি পেয়েছিলেন, নতুন নিয়মে সুবিধা পাচ্ছেন মূলত তারাই। উল্টো দিকে, রাজনৈতিক যোগাযোগের অভাবে যারা সময়মতো ডিএমডি হতে পারেননি, নতুন শর্ত তাদের জন্য কার্যত একটি অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাসের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার কথায়, নতুন কোনো সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত মন্ত্রণালয়কে চলতি নীতিমালা মেনেই এগোতে হবে— সরকার চাইলে ভবিষ্যতে তা পরিবর্তন করতে পারে। তিনি এটাও জানান, সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত কর্মকর্তাদের সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, এবং মন্ত্রণালয় নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত গুটিয়ে আনতে চাইছে।
আসলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন নতুন কিছু নয়। সরকার পতনের পর অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে সংস্কারের ঢেউ লাগলেও, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চূড়ান্ত নেতৃত্বে বড় কোনো রদবদল এখনো চোখে পড়েনি। এ কারণেই বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন— শুধু নতুন মুখ বসালেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং যোগ্যতাভিত্তিক, সেটিই আসল প্রশ্ন। কারণ এই ব্যাংকগুলোর ওপরই নির্ভর করে সরকারের উন্নয়ন-অর্থায়ন, সাধারণ আমানতকারীর আস্থা এবং সামগ্রিক ঋণ-শৃঙ্খলা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের বক্তব্য হলো, এমডি নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব এখতিয়ারের বিষয়— নীতিমালা বদলানো বা না বদলানো, দুটোই তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে তাদের প্রত্যাশা একটাই— প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়।