হাসমত আলী
সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী মাণিক্য মাধবের রথযাত্রা ও রথমেলা আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) থেকে গাজীপুর জেলা শহরের রথখোলায় শুরু হয়েছে।
রথযাত্রা ও রথমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম মঞ্জুরুল করিম রনি।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এবং রথযাত্রা ও রথমেলা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত থাকবেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরীফ উদ্দীন, বিএনপি নেতা মীর হালিমুজ্জামান ননী, ড. অ্যাডভোকেট শহীদুজ্জামান ও আহম্মদ আলী রুশদীসহ অন্যরা।
উদ্বোধনী দিনে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার নারী-পুরুষ বরাবরের মতো রথ টানায় অংশ নেবেন। রথযাত্রা উপলক্ষে প্রতিবছরই এখানে রথমেলার আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষে ইতিমধ্যে রথখোলা ও সংলগ্ন এলাকার রাস্তার দুই ধারে এবং ফাঁকা স্থানগুলোতে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পসরা সাজিয়ে বসেছেন নানা ধরনের দোকানি। মুড়ি-মুড়কি, খেলনা, তৈজসপত্র, আসবাবপত্রসহ বাহারি সব জিনিস উঠেছে দোকানে দোকানে। রথযাত্রা ও রথমেলা উপলক্ষে বসেছে নাগরদোলা ও সার্কাসও।
রথযাত্রা ও রথমেলা পরিচালনা কমিটি জানিয়েছে, আগামী ২৪ জুলাই (শুক্রবার) উল্টো রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। তবে রথমেলা চলবে আরও অন্তত ২০ দিন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুরে শ্রী শ্রী মাণিক্য মাধবের রথমেলা ও রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল প্রায় দেড়শ বছর আগে, যখন এই এলাকার শাসনক্ষমতায় ছিলেন ভাওয়াল রাজারা। তবে ভাওয়াল রাজবংশের ইতিহাস যত প্রাচীন, রথযাত্রার ইতিহাস তত প্রাচীন নয়।
ভাওয়াল রাজবংশের অষ্টম পুরুষ কালীনারায়ণ রায় ছিলেন সবচেয়ে খ্যাতিমান শাসক। তার শাসনামল থেকে জয়দেবপুরে রথযাত্রার প্রচলন শুরু হয়। কথিত আছে, রাজা কালীনারায়ণ রায়ের স্ত্রী সত্যভামা দেবী ছিলেন খুবই ধর্মপরায়ণ।
রাজবাড়ির অভ্যন্তরে পদ্মনাভ ঠাকুরঘরে পূজা-অর্চনার সময় একদিন সত্যভামা দেবী দৈববাণী শোনেন—দিঘি থেকে মাধবমূর্তি তুলে জয়দেবপুরে (গাজীপুরে) রথযাত্রার প্রচলন করতে হবে। মতান্তরে তিনি এ ঘটনা স্বপ্নে দেখেছিলেন।
পরে চান্দনা গ্রামের নবলক্ষ্মী দিঘি থেকে পাঁচটি এবং ভাওয়াল রাজদিঘি (মতান্তরে শ্রীপুর এলাকার রাজবাড়ির একটি দিঘি) থেকে দুটি মাধবমূর্তি পাওয়া যায়। শেষোক্ত দুটি মূর্তি তোলার সময় একটির নাক আংশিক কেটে গেলে সেটি আর তোলা হয়নি। বাকি ছয়টি মূর্তির নামকরণ করা হয়—মাণিক্য মাধব, ঠাকুর কুমার মাধব, চক্রপাণি মাধব, নীলাম্বর মাধব, যশোমাধব ও বাসুদেব মাধব। ১২৭৮ বঙ্গাব্দ (১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে মাণিক্য মাধবমূর্তি রথে অধিষ্ঠিত করে রথযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দেশের অন্যান্য স্থানের মতো মাধববাড়ি, মাধবমূর্তি ও রথেরও ক্ষতিসাধন করে। স্বাধীনতার পর ভাওয়াল রাজদিঘি থেকে দুটি মাধবমূর্তি উদ্ধার করা গেলেও বাকি চারটির খোঁজ মেলেনি। উদ্ধার হওয়া মূর্তির একটি মাণিক্য মাধবের বলে শনাক্ত করে সেটি দিয়েই এতদিন রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।
১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জের ধরে মাধবের শ্বশুরবাড়িতে রক্ষিত মাণিক্য মাধবের মূর্তিটিও ভাঙচুরের শিকার হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর মাটির তৈরি মূর্তি বানিয়ে তা রথে অধিষ্ঠিত করে রথযাত্রা চালানো হচ্ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে মাধববাড়িতে আর পূজা-অর্চনা হতো না; শহরের দক্ষিণ ছায়াবীথিতে মাধবের শ্বশুরবাড়িতেই তা চলছিল।
প্রায় এক যুগ আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংলগ্ন ভাওয়াল রাজবাড়ির পুরোনো স্থান সংস্কার করে মাধবকে নিজ বাড়িতে পুনঃস্থাপন করা হয়। এরপর ভারত থেকে কষ্টিপাথরে তৈরি একটি মাণিক্য মাধবমূর্তি সংগ্রহ করা হয়, যা দিয়ে এখন রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।