মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে অনিয়ম: আওয়ামী লীগের এমপিদের ৪টিসহ ৪৯ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান নামে দুদক।

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে অনিয়ম: আওয়ামী লীগের এমপিদের ৪টিসহ ৪৯ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও নানা অনিয়মের অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার। তালিকায় রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের অন্তত চারজন সাবেক সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও।

রবিবার (১৯ জুলাই) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই লাইসেন্স বাতিলের আদেশ জারি করে। 

মন্ত্রণালয় বলছে, এজেন্সিগুলো ২০১৩ সালের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন এবং ২০২৩ সালের সংশোধিত আইন মেনে চলার শর্তে লাইসেন্স পেয়েছিল। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আদালতে গৃহীত হওয়ায় আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী জনস্বার্থে লাইসেন্স প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলো সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী ও মেয়ের প্রতিষ্ঠান অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ও অরবিটাল ইন্টারন্যাশনাল। এছাড়া সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদের আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর স্নিগ্ধা ওভারসিজ এবং সাবেক এমপি অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনালও রয়েছে এই তালিকায়। জনশক্তি খাতের পরিচিত ব্যবসায়ী নূর আলীর ইউনিক ইস্টার্ন এবং কথিত মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত রুহুল আমিন ওরফে স্বপনের ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের নামও তালিকাভুক্ত হয়েছে।

অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়া বন্ধ রেখেছিল মালয়েশিয়া। তিন বছর পর, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে শ্রমচুক্তি সইয়ের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক পুনরায় চালু হয়, যেখানে শ্রমিক ভিসার সর্বোচ্চ খরচ বেঁধে দেওয়া হয় ৭৮ হাজার ৫৪০ টাকা।

২০১৬ সাল পর্যন্ত মাত্র ১০টি নির্ধারিত এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো হতো মালয়েশিয়ায়। ২০২১ সালের নতুন সমঝোতায় এজেন্সির সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ করা হলেও অভিযোগ ওঠে, এর মধ্যেও ২০-২৫টি এজেন্সি মিলে নতুন এক সিন্ডিকেট গড়ে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যে কয়েকটি এজেন্সি-কর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, আরও প্রায় ৬০টি মামলার প্রস্তুতি চলছে।

দুদকের হিসাবে, অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো এ পর্যন্ত ২ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে — সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার বদলে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি অর্থ আদায় করে। এভাবে মোট বাড়তি আদায় করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা।

উপরে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও লাইসেন্স বাতিল হওয়া অন্যান্য এজেন্সিগুলো হলো —মেসার্স শাহীন ট্রাভেলস, ইরভিং এন্টারপ্রাইজ, হেইডোরি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল, জাহরাত অ্যাসোসিয়েট, ফোর সাইট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, মেসার্স বিনিময় ইন্টারন্যাশনাল, আকাশ ভ্রমণ লিমিটেড, মেসার্স কিউ কে কুইক এক্সপ্রেস লিমিটেড, ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেড, জিএমজি ট্রেডিং (প্রাইভেট) লিমিটেড, সাদিয়া ইন্টারন্যাশনাল, দ্য সুপার ইস্টার্ন লিমিটেড, এলিগ্যান্টস ওভারসিজ লিমিটেড, মিডওয়ে ওভারসিজ লিমিটেড, মদিনা ওভারসিজ, আল-খামিস ইন্টারন্যাশনাল, নিউ এজ ইন্টারন্যাশনাল, ডাহমাশি করপোরেশন লিমিটেড, গ্যালাক্সি করপোরেশন, সুলতান ওভারসিজ, প্রভাতী ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানিসপাওয়ার করপোরেশন, আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, দরবার গ্লোবাল ওভারসিজ, নাতাশা ওভারসিজ, অপরাজিতা ওভারসিজ, স্ট্যানফোর্ড এমপ্লয়মেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড, জান্নাত ওভারসিজ, বিএম ট্রাভেলস লিমিটেড, রুবেল বাংলাদেশ লিমিটেড, বিএনএস ওভারসিজ লিমিটেড, ট্রান্স এশিয়া ইন্টিগ্রেট সার্ভিসেস লিমিটেড, আল ফারাহ হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড কনসালটেন্সি, ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল, অনন্য অপূর্ব রিক্রুটিং এজেন্সি, থানেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, জে জি আলফালাহ ম্যানেজমেন্ট, ইম্পেরিয়াল রিসোর্সেস লিমিটেড, পি.আর. ওভারসিজ লিমিটেড এবং মেসার্স এমইএফ গ্লোবাল বাংলাদেশ লিমিটেড।