বিক্ষোভস্থল থেকে আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা, বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো কংগ্রেস নেতাদের

সরে যেতে অস্বীকার করলে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে নেওয়া হয়, এ সময় তাঁর নাক থেকে রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়।

বিক্ষোভস্থল থেকে আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা, বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো কংগ্রেস নেতাদের

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক 

প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবন অভিমুখে কংগ্রেসের বিক্ষোভ মিছিল ঘিরে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভারতীয় রাজনীতিতে নাটকীয় এক দিন পার হলো। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশি হস্তক্ষেপে ভেঙে দেওয়া হয় এবং রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাড্রাসহ নেতাদের আটক করে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

সোমবার ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ডাকে সংসদ অভিমুখী ছাত্র মিছিলের একদিন পর কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে মঙ্গলবার বিকেলে কংগ্রেস সভাপতির ১০ রাজাজি মার্গের বাসভবনের সামনে জড়ো হন রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাড্রা। সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে প্রধানমন্ত্রীর ৭ লোক কল্যাণ মার্গের বাসভবন অভিমুখে মিছিল নিয়ে যান তাঁরা।

সড়কে বসে অবস্থান নেওয়া রাহুল গান্ধীকে ঘিরে ফেলেন অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য। সরে যেতে অস্বীকার করলে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে নেওয়া হয়, এ সময় তাঁর নাক থেকে রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়।

পরে সড়কে শুয়ে থাকা অবস্থায় সাংবাদিকদের রাহুল গান্ধী বলেন, ভারতে এই মুহূর্তেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বিক্ষোভ ভেঙে দেওয়ার আগে সূত্রের বরাতে জানা গিয়েছিল, তিনি সারারাত অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে যোগ দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং বিক্ষোভস্থলে গিয়ে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথা বলেন, তবে কংগ্রেস নেতারা জানান, এই আলোচনা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। কংগ্রেস সাংসদ সৈয়দ নাসির হুসেন বলেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ প্রত্যাহারে রাজি হননি তাঁরা। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ও সংসদে প্রশ্নফাঁস নিয়ে আলোচনার দাবিতে অনড় থাকার কথা জানান তিনি এবং আরও সাংসদ ও সমর্থক বিক্ষোভে যোগ দেবেন বলেও জানান।

তবে ভিন্ন দাবি করেছেন মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। তাঁর অভিযোগ, সরকার সংসদে নিট ও প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত সব বিষয়ে আলোচনায় রাজি হলে বিক্ষোভ প্রত্যাহারের আশ্বাস দিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী, কিন্তু পরে তা থেকে সরে আসেন। এক্স হ্যান্ডেলে হিন্দিতে দেওয়া পোস্টে সিং লেখেন, এই বার্তা রাহুল গান্ধীকে জানানো হলে তিনি একা এই শর্তে রাজি না হয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেন এবং আগে শুধু আলোচনার দাবি করেছিলেন মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, তাঁর দাবি বদলে গেছে। মন্ত্রীর এই বিবৃতির পরপরই পুলিশ বিক্ষোভ ভেঙে দেওয়া শুরু করে।

বিক্ষোভ শুরুর পরপরই এক্সে দেওয়া পোস্টে রাহুল গান্ধী বলেন, ছাত্রদের ওপর ‘নিষ্ঠুরতা’র জবাবদিহি চাইতেই তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গেছেন। সিজেপির দাবি থেকে এক ধাপ এগিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগও দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, সরকার কোনো জবাবদিহি নিতে চায় না, সংসদেও এ নিয়ে বিতর্ক চায় না, আর তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের দায়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।

আরেকটি পোস্টে তিনি বলেন, ছাত্রদের ওপর হামলা প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর হামলার শামিল এবং প্রধানমন্ত্রী মোদী মনে করছেন জবাবদিহি ও পরিণতি ছাড়াই পার পাবেন। ছাত্রদের ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিককে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধরনায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কংগ্রেসের এই কর্মসূচিতে অপ্রস্তুত দিল্লি পুলিশ দ্রুত অতিরিক্ত ফোর্স পাঠিয়ে বিক্ষোভকারীদের আটক করতে শুরু করে। বিজেপির অভিযোগ, কংগ্রেস এই বিক্ষোভের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলছে। তবে ঘটনাস্থলে থাকা কংগ্রেস নেতারা দাবি করেন, তাঁদের অবস্থান সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কংগ্রেস সাংসদ মানিক্কম ঠাকুর বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে যান না বললেই চলে, আগের দিনও অল্প সময় থেকেই চলে গেছেন— তাই কোথায় গিয়ে তাঁদের কথা শোনানো হবে, প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সন্ধ্যার দিকে বিক্ষোভে যোগ দেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব ও এনসিপি (শারদচন্দ্র পাওয়ার)-এর শীর্ষ নেতা সুপ্রিয়া সুলে। তবে বিরোধী জোটে ফাটলের ইঙ্গিত দিয়ে আম আদমি পার্টি (আপ) দাবি করে, কংগ্রেসের এই বিক্ষোভ আসলে বিজেপিরই উসকানিতে হচ্ছে, যাতে সিজেপির আন্দোলন থেকে দৃষ্টি সরানো যায়।

সোমবার বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর পর থেকে দুই দিনই সংসদ মুলতবি হয়ে গেছে। প্রশ্নফাঁস ও সিজেপির বিক্ষোভ নিয়ে সংসদে আলোচনার চেষ্টা করেও তাঁদের কথা বলতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ কংগ্রেসের। রাজ্যসভায় বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বিক্ষোভের আগে সংসদের বাইরে বলেন, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শিকার হওয়া ছাত্রদের পক্ষে কথা বলার সুযোগ চাইলেও এক শব্দ বলার পরই তাঁর মাইক্রোফোন বন্ধ করে দেওয়া হয়— এমন পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রে বিরোধী স্বর কোথায় শোনানো হবে, প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সোমবার সংসদ অভিমুখী সিজেপির মিছিলে বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী ছিলেন ছাত্র ও তরুণ। পুলিশ ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স তাঁদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে বলে সিজেপির অভিযোগ, যাতে বেশ কয়েকজন আহত হন। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা ‘বিশৃঙ্খল, আক্রমণাত্মক ও সহিংস’ আচরণ করেছেন, পুলিশ সদস্যদের ওপর পাথর ছুড়েছেন এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করেছেন। পুলিশের ভাষ্যমতে এই ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

সোমবার সিজেপির প্রতিনিধিরা বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডার সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেন এবং মঙ্গলবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাম মনোহর লোহিয়া ও লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে আহত বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দেখা করেন। সরকারের ভাষ্য, বিক্ষোভকারীদের দাবি শুনতে তারা প্রস্তুত, তবে কোনো সহিংসতা বরদাশত করা হবে না।

মঙ্গলবার নিট প্রশ্নফাঁস প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা জাতীয় দায়িত্ব। এনডিএ সংসদীয় দলের বৈঠকে যা বলা হয়েছে তার বরাত দিয়ে কেন্দ্রীয় সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, প্রধানমন্ত্রী শরিক দলগুলোকে সংসদীয় কার্যক্রমে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বিরোধীদের গঠনমূলকভাবে সংসদে কাজ করার অনুরোধ করেছেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও দেশের ভবিষ্যৎ ও তরুণদের কল্যাণে সব সাংসদের অভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী মোদী আরও বলেন, নিট প্রশ্নফাঁসের খবর পাওয়ার পরপরই সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে, যার ফলে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তারসহ দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।