গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
পণ্য উৎপাদনে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বন্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের ওপর ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের আইনি ধাক্কা সামলে বিশ্ব বাণিজ্যে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বহাল রাখতেই ওয়াশিংটনের এই নতুন কৌশল।
বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির প্রায় ৯৯.৪ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে এই নতুন শুল্কহার কার্যকর হচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে আরোপিত ১০ শতাংশ সাময়িক বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন, অর্থাৎ শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকেই এই নতুন সিদ্ধান্ত বলবৎ হচ্ছে।
তবে কার্যকর হওয়ার আগে যেসব পণ্য পরিবহনে ছিল, সেগুলো ২৮ জুলাই পর্যন্ত এই নতুন শুল্কের বাইরে থাকবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর ক্ষমতায় আসার পর বিশ্ব বাণিজ্যে যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, এটি তারই সবশেষ সংযোজন।
কার ওপর কত শুল্ক
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বা আংশিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাদের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, গুয়াতেমালা, এল সালভেদর, হন্ডুরাস, ইকুয়েডর, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো–এই ১৭টি দেশ ১০ শতাংশ শুল্কের এই তালিকায় রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের মত (মোস্ট-ফেভার্ড-নেশন) দেশের ক্ষেত্রে তাদের বিদ্যমান সুবিধাপ্রাপ্ত বাণিজ্য হার সমন্বয় করে মোট ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে ‘পর্যাপ্ত আইনি কাঠামো তৈরিতে ব্যর্থ’ হওয়া বাকি সব তদন্তাধীন দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক বসবে। চীন, ভিয়েতনামসহ ৩৮টি দেশ রয়েছে এই তালিকায়।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক শতাব্দী ধরে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে আসছে এবং কঠোরভাবে সেই আইন প্রয়োগ করছে। এখন সময় এসেছে, তাদের বাণিজ্য অংশীদাররাও একই ধরনের পদক্ষেপ নেবে।”
তার দাবি, নতুন এ পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে প্রতিযোগিতাগত বৈষম্য তৈরি হয়, তা কমাতে সহায়তা করবে এবং বিশ্বের শ্রমিকদের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে।
যেসব পণ্য পাচ্ছে শুল্ক ছাড়
মার্কিন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির বড় ধাক্কা এড়াতে বেশ কিছু জরুরি পণ্যকে এই শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। ছাড়প্রাপ্ত পণ্যের তালিকায় রয়েছে–
- অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস
- কৃষি সার ও নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্য
- উড়োজাহাজ ও এর যন্ত্রাংশ
- জরুরি খনিজ উপাদান
- স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও অটোমোবাইল (যেগুলো আগে থেকেই সেকশন ২৩২-এর আওতায় রয়েছে)
- ইউএসএমসিএ বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণকারী উত্তর আমেরিকান পণ্যগুলো।
- আদালতের আদেশ ও আইনি কৌশল
চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, জরুরি ক্ষমতার আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর যে আমদানি শুল্ক আরোপ করেছিল, তার বৈধ ছিল না।
আদালতের ওই আদেশের পর মূল শুল্কনীতি বজায় রাখতে বিকল্প পথ হিসেবে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ৩০১’ প্রয়োগ করে ইউএসটিআর, যা ‘মার্কিন বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে’–এমন আন্তর্জাতিক নীতি মোকাবিলার আইনি সুযোগ দেয়।
সেই ১০ শতাংশ সাময়িক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন নতুন নামে প্রায় একই হারের নতুন শুল্ক আরোপ করল ট্রাম্প প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
মার্কিন সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায্য ও স্বেচ্ছাচারী’ আখ্যা দিয়ে ব্রাজিল সরকার বলেছে, ওয়াশিংটন তাদের সংরক্ষণবাদী শুল্কনীতি বাস্তবায়নে শ্রমিক অধিকারের মত বিষয়টিকে অপব্যবহার করছে।
১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়া ব্রাজিল নিজেদের ‘রেসিপ্রোসিটি আইন’ অনুযায়ী পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া ও বিকল্প বাজার খোঁজার ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে মার্কিন সিদ্ধান্তের পর গভীর ‘হতাশা’ প্রকাশ করে জাপান সরকার বলেছে, তাদের বৈশ্বিক বাণিজ্য সর্বদা আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য মন্ত্রী ডন ফারেল এই শুল্ককে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, ইউরোপে শ্রমিক সুরক্ষার আইন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী; তাই যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এর আগে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’তে বিশ্ব বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপিয়েছিলেন ট্রাম্প।
কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্ট সেই শুল্ক বাতিল করলে হাজার কোটি ডলার অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
এরপর থেকেই বিকল্প উপায়ে নতুন শুল্ক আরোপের পথ খুঁজছিল হোয়াইট হাউস।
বর্তমানে পণ্যের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার (ম্যানুফ্যাকচারিং ওভারক্যাপাসিটি) অভিযোগে আরও ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, যা ভবিষ্যতে শুল্কের পরিধি আরও বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।