গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের ওপর সাম্প্রতিক একের পর এক হামলাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। এসব হামলার জন্য বিএনপির ছাত্র ও যুব সংগঠনের কর্মীদের দায়ী করা হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর পেছনে ভিন্ন কারণ দেখছেন।
বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, এসব হামলার আড়ালে এনসিপির নিজস্ব সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নড়বড়ে অবস্থান—উভয় বিষয়ই ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, যা ধীরে ধীরে দলটির প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে কী ঘটেছিল?
হবিগঞ্জে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনার পর সিলেট অঞ্চল থেকে মিছিল শেষে ফেরার পথে হামলার শিকার হন এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী। স্থানীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে তাঁর কিছু বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে স্থানীয় বিএনপি সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়ে এই হামলা চালান বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা এটিকে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো ও গভীর সমস্যা—ভিন্নমত সহ্য করতে না পেরে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া—হিসেবেই দেখছেন।
এনসিপির জন্ম কীভাবে, প্রত্যাশা কেমন ছিল?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এনসিপি শুরুতে তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পায়। সে সময় আওয়ামী লীগ মূলধারার রাজনীতি থেকে অনুপস্থিত এবং বিএনপি একক প্রধান শক্তি হিসেবে থাকায়, অনেকে এনসিপিকে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় বিকল্প’ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে অবশ্য এই জনপ্রিয়তার পেছনে দলের সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে আন্দোলনকেন্দ্রিক আবেগই বেশি কাজ করেছিল।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দলটি ৬টি আসনে জয়ী হয়ে বিরোধী জোটের একটি ছোট অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
কেন কমছে আস্থা?
আন্দোলনের প্রতিশ্রুত সংস্কার—বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন—প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। আন্দোলন, অন্তর্বর্তী সরকার ও এনসিপির মধ্যে জনগণের চোখে স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি না হওয়ায়, সরকারের ধীরগতির দায়ও অনেকাংশে এনসিপির ওপর বর্তেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বচ্ছতার প্রশ্ন। উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া এবং একাধিক উপদেষ্টা ও সাবেক ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে অনিয়মের গুঞ্জন—যদিও তদন্তে এখনো প্রমাণিত হয়নি—দলটির ভাবমূর্তিতে আঘাত হেনেছে।
২০২৫ সালে ঘোষিত ক্রাউডফান্ডিং তহবিলের হিসাবও অস্পষ্ট থেকে গেছে। বন্যার্তদের জন্য সংগৃহীত ১১ কোটি টাকারও বেশি অর্থের মধ্যে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও বাকি অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
নেতাদের জীবনযাপন নিয়ে কী বলা হচ্ছে?
কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতার জীবনযাত্রায় লক্ষণীয় পরিবর্তন—দামি গাড়ি ব্যবহার বা প্রভাবশালীদের সঙ্গে মেলামেশা—সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রমাণ ছাড়া কাউকে দুর্নীতিবাজ বলা যায় না, তবে আন্দোলনের সময়কার নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে এই বৈপরীত্য দলের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করছে।
আন্দোলন থেকে দলে রূপান্তর কতটা সফল হয়েছে?
রাজপথের গণজোয়ারকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ দেওয়া এনসিপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, শিক্ষা বা প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতি না থাকায় দলটি মূলত প্রতিক্রিয়ামূলক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে বলে সমালোচকরা মনে করেন।
হামলা কি এসব সমালোচনার প্রতিক্রিয়া?
বিশ্লেষকরা একমত যে, দলটির দুর্বলতা যা-ই থাকুক, তা কর্মীদের ওপর হামলাকে বৈধতা দেয় না। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শান্তিপূর্ণ হওয়া উচিত বলে তাঁরা মনে করিয়ে দেন। তবে হামলার পর সৃষ্ট সাময়িক সহানুভূতি স্থায়ী জনসমর্থনে রূপ নেয়নি, কারণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে মানুষের মূল প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি।
এখন এনসিপির সামনে কী পথ খোলা?
বিশ্লেষকদের পরামর্শ, আস্থা ফেরাতে হলে দলকে আয়-ব্যয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা আনতে হবে, অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়াতে হবে, মূল সমস্যাগুলোতে স্পষ্ট নীতি দিতে হবে এবং নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে।
এনসিপির ভবিষ্যৎ শুধু ‘জুলাই আন্দোলনের সন্তান’ পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না—বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে তারা কতটা যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে তাদের রাজনৈতিক টিকে থাকা।
সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ