গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
গ্যাস ও কয়লা সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমে আসায় সারা দেশে চলছে তীব্র লোডশেডিং। গ্রামাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে চরম ভোগান্তিতে পড়া মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে পল্লী বিদ্যুতের অফিসে হামলা, ঘেরাও ও কর্মীদের অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সহিংসতা এড়াতে পুলিশের কাছে জরুরি নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। অবশ্য এই চিঠির সঙ্গে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি আরও জানান, এই সংগঠনের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
সরবরাহের মারাত্মক ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে আছে। আবার এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে কয়লার টানাপোড়েন। মে মাসে যেখানে উৎপাদন ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছুঁয়েছিল, তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ থেকে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটে। ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট।
সরকার ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কথা বললেও দিনে দিনে সংকটের মাত্রা কেবল বাড়ছেই। শহর এলাকায় কিছুটা বিদ্যুৎ থাকলেও গ্রামের মানুষ দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছে না।
পরিস্থিতি কতখানি সংকটজনক, তা বোঝাতে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। সেখানে ১ দশমিক ৩ মেগাওয়াট সরবরাহের হিসাব দেখিয়ে তিনি বলেন, সংকটের তীব্রতায় তার চারটি লাইনের মধ্যে তিনটিই সারাক্ষণ বন্ধ রাখতে হয়। একেকটি লাইনে বিদ্যুৎ ফিরতে অন্তত তিন ঘণ্টা পার হয়ে যায়। কর্মজীবনের ইতিহাসে তিনি এত খারাপ অবস্থা আর দেখেননি।
দিনাজপুরে ১০ দিনে দুই কার্যালয়ে হামলা
গত ১ আগস্ট রাতে দিনাজপুরের আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে প্রতিবাদ জানায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা। এর ১০ দিন পরই নবাবগঞ্জ উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়।
দিনাজপুর জেলা শহরে দিনে পাঁচবারেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গ্রামগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। বিতরণ সংস্থা নেসকো-২ এলাকার বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে ২৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মেলে মাত্র ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট। নেসকো-১ এলাকায় আবাসিক খাতে ২১ মেগাওয়াটের বিপরীতে দেয়া হচ্ছে ১৬ মেগাওয়াট।
সবচেয়ে খারাপ দশা পল্লী বিদ্যুতের। দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর দিনে ১৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও তারা অনেক সময় অর্ধেকের কম, মাত্র ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে। চাল উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হওয়ায় দিনাজপুরের রাইস মিলগুলো কাজ চালাতে পারছে না, যা চালের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
পাবনায় জনতার হাতে লাইনম্যান আটক
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি এলাকায় মঙ্গলবার বিকালে পল্লী বিদ্যুতের কর্মী আইনুল হোসেনকে আটকে রাখে স্থানীয়রা। তীব্র গরমের মধ্যে রিডিং লিখতে গেলে অতিষ্ঠ মানুষ তাকে জেরা করা শুরু করে এবং চার ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ করে রাখে।
ঘটনা সম্পর্কে আইনুল সংবাদ মাধ্যমকে জানান, লোডশেডিং কোনো একক গ্রামের সমস্যা নয়, এটি পুরো দেশের সমস্যা। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কথায় তিনি বিল লেখার কাজ বন্ধ রেখেই চলে আসেন।
পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর প্রধান কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল আমিন চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তাদের ৯১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া গেছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়ে এলাকা ভাগ করে এক-দুই ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
সিলেটে সড়ক অবরোধ
বিদ্যুতের দাবিতে সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ও নগরীর টুকেরবাজারে গত রবিবার রাতে সড়ক বন্ধ করে বিক্ষোভ করে স্থানীয় জনগণ।
সিলেটের নাজমুল ইসলাম নামের এক ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মী সংবাদ মাধ্যমকে জানান, সারাক্ষণ অনলাইনে কাজ করতে হলেও কয়েকদিন ধরে দিনে বা রাতে কোনো সময়েই ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
নগরীর বহুতল ভবনের মালিক লোকমান আহমদ আক্ষেপ করে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আধুনিক সময়ে এসেও হারিকেন যুগের মতো কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। তার বাসায় থাকা ভাড়াটিয়াদের ফ্রিজের রাখা খাবার পচে যাওয়ায় ফেলে দিতে হয়েছে।
সিলেট জেলায় চাহিদার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ সরবরাহ থাকলেও পল্লী এলাকায় সরবরাহ বেশ কম। সিলেটে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন জানান, তারা ওপরের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানিয়েছেন এবং সমস্যা মেটানোর পথ খোঁজা হচ্ছে।
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা চেয়ে বিতরণ সংস্থার চিঠি
অসন্তোষের কারণে গ্রাহকেরা অফিসে হামলা চালাতে পারে—এমন ভয়ে নিজস্ব কার্যালয় ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা চেয়ে গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)।
সংস্থার কর্মকর্তা মো. মাঈন উদ্দিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, দিনে ১২ থেকে ১৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তারা মাত্র ৯ মেগাওয়াট পাচ্ছেন। পরীক্ষা চলায় বিভিন্ন স্কুল ও হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার চেষ্টা করায় অন্যান্য এলাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ সংবাদ মাধ্যমকে জানান, চিঠি পেলেই তিনি নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
বিদ্যুৎ না থাকায় স্থানীয় জীবন থমকে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিকতার চৌধুরী, সংবাদকর্মী আরিফুল হক এবং ব্যবসায়ী উজ্জ্বল বিশ্বাস সংবাদ মাধ্যমকে জানান, বিদ্যুতের অভাবে তাদের নিত্যদিনের কাজ, সংবাদের কাজ ও দোকানপাট চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেত্রকোণায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং
নেত্রকোণা জেলায় ১৫০ থেকে ১৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে অর্ধেকেরও কম পাওয়া যাচ্ছে। নেত্রকোণা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, গত দুই দিনে ১৩০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া গেছে মাত্র ৫৮ মেগাওয়াট।
পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাদেকুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, শহর এলাকায় সরকারি অফিস ও হাসপাতাল থাকায় কিছুটা কম বিদ্যুৎ কাটা হলেও গ্রাম অঞ্চলে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই আলো থাকছে না।
বানিয়াজান গ্রামের আঙুর মিয়া, মোহনগঞ্জের কামরুজ্জামান এবং শহরের সালাহ উদ্দিন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না, গরমে ঘুম আসছে না এবং সন্তানদের লেখাপড়া পুরোপুরি বন্ধের পথে।
রংপুর অঞ্চলে সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন
রংপুর বিভাগের ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনোটি পুরোপুরি বন্ধ, আবার কোনোটি কম ক্ষমতায় চলছে। এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে এখানে সরকারি হিসাবেই ঘাটের পরিমাণ তিনশ মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
এ অঞ্চলের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ১১২ মেগাওয়াট হলেও গত রোববার পাওয়া গেছে মাত্র ৫৫৬ মেগাওয়াট। রংপুর শহরের মোড়ে মোড়ে এক ঘণ্টা পর পর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা বিথীকা রায় বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার কারণে কারখানা ও কাঁচামাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নেসকোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল আলম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে যতটুকু মিলছে, তারা ততটুকুই বিতরণ করছেন।
বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুফল নেই খুলনায়
খুলনার ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে খুলনার মূল কেন্দ্র, ফরিদপুর, নর্থ ওয়েস্ট, মধুমতী ও রূপসাসহ অন্তত ৬টি বড় কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া ও কয়রা উপজেলায় কষ্ট সবচেয়ে বেশি। ব্যবসায়ী রাম প্রসাদ, চাকরিজীবী নূরে আলম এবং ইজিবাইক চালক মুন্না মিয়া সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ফ্রিজের পণ্য নষ্ট হয়ে ব্যবসায় ধস নেমেছে। চার্জ দিতে না পেরে অটোরিকশা চালানো বন্ধের পথে।
ওজোপাডিকোর পরিচালনা প্রধান জাকিরুজ্জামান ব্যবসায়ীদের অপচয় কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তা তুষার কান্তি ১০ শতাংশ ঘাটতির হিসাব দিলেও মাঠপর্যায়ের আসল চিত্র বেশ আশঙ্কাজনক।
সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ