গাজীপুর কণ্ঠ, বিনোদন ডেস্ক
তিন দশক আগে ঢাকাই সিনেমার নায়ক সালমান শাহকে হত্যার দাবি করে এখনো বিচারের আশায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তার পরিবার।
জনপ্রিয় এ অভিনেতা ‘আত্মহত্যা করেছেন’ বলে চার তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন দিলেও তা মানতে নারাজ পরিবারের সদস্যরা। সবশেষ আসামিদের অব্যাহতির আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদনের পর নতুন করে মামলা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন খল অভিনেতা মোহাম্মদ আশরাফুল হক ডন।
তবে অন্য আসামিদের কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তুলে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। তিনি আছেন লন্ডনে।
নীলা চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “আশায় আছি, মামলার তদন্ত শেষ হবে, বিচার হবে।”
তিনি বলেন, “আসামিরা দেশে আছে, কেন তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না বুঝতে পারছি না। ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? আসামিদের তো দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আছে। তার মানে তারা দেশেই আছে। তারপরও কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না?
“আসামিদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলে হত্যার সব রহস্য বেরিয়ে আসবে। আশা করছি, তদন্ত সংস্থা আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করবে এবং মামলার তদন্ত শেষ করবে।”
মামলার বাদী সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “সালমান শাহ হত্যা মামলার বিচার শুধু আমরা না, দেশের জনগণও চায়।”
“সালমান শাহকে হত্যার সময় বাসায় সামিরা, ডলি, মনোয়ার, আবুল (বাসার কাজের লোক) বাসায় ছিল। তাদের গ্রেপ্তার করলে সব বের হয়ে আসবে। পুলিশ সামিরাকে পায় না। তার সবশেষ স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই জানা যাবে সে কোথায় আছে। সামিরার মা কোথায়, সেটি তার বাবাকে গ্রেপ্তার করলে বের হয়ে আসবে।”
ডনের গ্রেপ্তার নিয়ে তিনি বলেন, “রেজভী নামে এক আসামির বক্তব্যে ডনের সম্পৃক্ততা আসে। আমরা চাই, আসামিরা গ্রেপ্তার হোক এবং মামলার বিচার দ্রুত শেষ হোক।”
তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “তদন্ত চলছে। এক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। অপর আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”
এর বেশি কিছু বলতে চাননি মজিবুর রহমান; সিআইডির মিডিয়া সেলের মাধ্যমে খবর নিতে বলেন তিনি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “অনেক বছর গেছে। নতুন করে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত যেন দ্রুত শেষ হয়। আসামিদের যত দ্রুত সম্ভব গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়। আসামিদের সাজা যেন নিশ্চিত হয়।”
সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা ডনের আইনজীবী এম ফরিদুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “এভাবে মোবাইল ফোনে কথা বলা যায় না। চেম্বারে আসেন বলব।”
আইনি লড়াইয়ের ৩ দশক
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দেশের চলচ্চিত্র জগতে সে সময় তিনি তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন।
ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।
তখন অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সিআইডি বলে, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেন।
কিন্তু সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত।
এর দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ অগাস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। তাতেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
কিন্তু সালমানের মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন। ১১ জনের নাম তুলে ধরে নীলা চৌধুরী দাবি করেন, তারা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
মামলাটি এরপর তদন্ত করে র্যাব। তখন রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।
তখন তদন্তের দায়িত্বে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।
সেখানেও বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে এবং জব্দ আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি।
পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদনে বলে, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরার কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ‘অভিমানী’ সালমান আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
ওই প্রতিবেদনেও অসন্তুষ্টি জানিয়ে ছেলের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে আরও তদন্ত চান নীলা চৌধুরী। এর মধ্যে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।
এরপর আবার সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।
এ বিষয়ে সালমানের বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়।
পিবিআই ২০২০ যখন এ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, ডন তখন বলেছিলেন, “আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। অবশেষে কলিজার বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম।”
তিনি বলেছিলেন, “২৪টা বছর বুকের ভেতর বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আমাকে ঘুরতে হয়েছে। আমার যে ক্ষতি হয়েছে তার পূরণ কিছুতেই হবে না। আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম। সত্য কোনো দিন মিথ্যা হয় না। মিথ্যাকেও কোনো দিন জোর করে সত্যি বানানো যায় না।”
ওই বক্তব্য দেওয়ার ছয় বছর পর সালমান শাহ হত্যা মামলাতেই গ্রেপ্তার হন ডন।
সামিরা ও ডন ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন- সামিরার মা লতিফা হক লুসি, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এছাড়া নাম ছাড়া আরও অনেককে আসামি করা হয়।
সূত্র: বিডিনিউজ