গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের বৈঠকে ইরান যুদ্ধের সমাধানে কূটনৈতিক পথ বেরিয়ে আসার আশায় সোমবার জ্বালানি তেলের দাম গত এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের চলমান হামলা সত্ত্বেও সৌদি আরব থেকে তেলের সরবরাহ আংশিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায়ও কমেছে তেলের দাম।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিনের শুরুতেই ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস ও ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।
শুক্রবার ০.৯১ শতাংশ কমার পর গ্রিনিচ মান সময় ০২১৩-এ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২.১৬ ডলার (বা ২.০৮ শতাংশ) কমে ১০১.৭১ ডলারে নেমে আসে।
অন্যদিকে আগের সেশনে ১.৫৮ শতাংশ পতনের পর ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২.১৫ ডলার (বা ২.১৪ শতাংশ) কমে দাঁড়িয়েছে ৯৮.১৫ ডলার।
কেসিএম ট্রেড-এর প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটেরার বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক পথ খুলতে পারে। সেই আশাতেই তেলের বাজার থেকে ঝুঁকির প্রিমিয়াম কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে।
‘তবে এই আশা শেষ পর্যন্ত কতটা যৌক্তিক প্রমাণিত হবে, সেটা একেবারেই ভিন্ন প্রশ্ন। সময়ই এর উত্তর দেবে।’
যুদ্ধের টানাপোড়েন ও অচলাবস্থার মাঝেই রোববার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরকে নতুন করে হুমকি দিয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে এ সপ্তাহে নিউইয়র্ক সফরে আসা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বসতে তিনি প্রস্তুত।
অন্নদিকে শনিবার এক সাক্ষাৎকারে ইরানের নিরাপত্তা-প্রধান মোহসেন রেজাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ফের আলোচনায় বসতে মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নিজেদের শর্তগুলো এরইমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে তেহরান।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ এখনও ঊর্ধ্বমুখী। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, শনিবার তারা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একাধিক ‘স্পর্শকাতর’ স্থাপনায় মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বাদ যায়নি লোহিত সাগর তীরের শহর ইয়ানবুতে অবস্থিত আরামকো-র একটি কারখানাও, যা তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
এই হামলার পরপরই বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হয় সৌদি আরব। বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তিনটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের অনুরোধে সাড়া দিয়ে হুথিদের লাগাম টানতে ইরানকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে চিন।
সৌদি আরামকোর ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর হুথিদের হামলার জেরে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেলের বেশ কিছু চালান আপাতত স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানটি। তবে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চলতি ও আগামী মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের রপ্তানি অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।
বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার-এর প্রাথমিক তথ্য বলছে, আগস্টে ওপেকের এই শীর্ষ দেশটির তেল রপ্তানি তলানিতে ঠেকেছিল। সে সময় দৈনিক মাত্র ২৪ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হচ্ছিল, যা অন্তত ২০১৩ সালের পর সর্বনিম্ন। তবে বিকল্প পথে হাঁটায় সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত সেই রপ্তানি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে; ছাড়িয়ে গেছে দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেলের গণ্ডি।
জেপি মর্গ্যান-এর বিশ্লেষকরা ১৮ সেপ্টেম্বরের এক নোটে বলেছেন, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ আশ্চর্যজনকভাবে জোরালো রয়েছে। তারা আরও জানান, গত ১০ দিনে গড়ে দৈনিক ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের গড়ের চেয়ে মাত্র ৬১ লাখ ব্যারেল কম।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বাঁকবদলটি এসেছে খোদ সৌদি আরবের পক্ষ থেকেই।’ স্যাটেলাইটের তথ্যে দেখা গেছে, গত ছয় দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে গড়ে দৈনিক ২৯ লাখ ব্যারেল সৌদি তেল বিশ্ববাজারে গেছে, যেখানে আগস্টে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ লাখ ব্যারেল।