দ্য গার্ডিয়ান
ইউরোপের অন্তত সাতটি দেশের সুপারশপ চেইনে এক রাতের মধ্যে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বেড়ে গেছে। গত মাসে ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া একই ধরনের সাইবার হামলার সঙ্গে এর মিল পাওয়া যাচ্ছে। ওই হামলায় কয়েক কোটি ইউরোর ক্ষতি হয়েছিল।
সোমবার বেলজিয়াম, এস্তোনিয়া, আয়ারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের খুচরা বিক্রেতারা তাঁদের হিমায়ন ব্যবস্থায় সমস্যার কথা জানান। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করেছে, তাদের সিস্টেম হ্যাক করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টোফ হানসেন বলেছেন, বারবার এ ধরনের সাইবার হামলা গভীর উদ্বেগের বিষয়। তাঁর ভাষায়, এটি ‘আমাদের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করা এবং এর প্রতি ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট করার সুচিন্তিত প্রচেষ্টা’।
গত মাসে ফ্রান্সে হ্যাকাররা প্রায় ৭০০টি সুপারশপের হিমায়ন যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তুলে দেয়। এতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং খাদ্যপণ্যের যে ক্ষতি হয়, তা কয়েক কোটি ইউরো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেফ্রিজারেশনসহ বিভিন্ন যন্ত্র এখন দূর থেকে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে আশঙ্কা করছে, রাষ্ট্রীয় মদদে হাইব্রিড হামলা হতে পারে।
সুইডেনের সুপারশপ চেইন কুপ দৈনিক আফটনব্লাদেটকে জানিয়েছে, তাদের ছয়টি দোকান হামলার শিকার হয়েছে। আইসিএ জানিয়েছে, রাতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় ‘সীমিত সংখ্যক’ দোকানের হিমায়ন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দক্ষিণ সুইডেনের শিওবুতে আইসিএর একটি দোকান জানিয়েছে, তাদের ফ্রিজ ও ফ্রিজার হ্যাক করে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তোলা হয়েছিল। স্টকহোমের আরেকটি দোকান জানায়, রাত ২টার সাইবার হামলায় তাদের ফ্রিজার অকেজো হয়ে গেছে এবং ‘সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে’।
সুইডেনের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রের প্রধান জন বিলো রয়টার্সকে বলেছেন, দেশজুড়ে ঘটা ঘটনাগুলো নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। তিনি জানান, দেশে ‘বেশ কিছু অরক্ষিত অপারেশনাল টেকনোলজি ডিভাইস’ রয়েছে, যেগুলো হালনাগাদ বা প্যাচ করা প্রয়োজন।
ডাচ খুচরা বিক্রেতা আহোল্ড ডেলহেইজ গত মাসে নেদারল্যান্ডসে একই ধরনের ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে জানিয়েছিল। এবার তারা জানিয়েছে, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গে তাদের কয়েক ডজন সুপারশপের ফ্রিজ-ফ্রিজার আক্রান্ত হয়েছে। কারণ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কিছু বলেনি। তবে ব্রাসেলসের উত্তর-পূর্বে একটি দোকানে গিয়ে সাংবাদিকেরা ফাঁকা ফ্রিজ-ফ্রিজার এবং একটি নোটিশ দেখেছেন। নোটিশে লেখা ছিল, ‘সাইবার হামলার কারণে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাকগুলোতে কোনো পণ্য থাকবে না। আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’

কোম্পানির মুখপাত্র সারা দে মেস্টার বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোয় তাজা ও হিমায়িত পণ্যের সরবরাহ ‘সাময়িকভাবে কিছুটা সীমিত’ হয়ে পড়েছে। তবে বিতরণকেন্দ্রগুলো স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং পণ্য সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
বেলজিয়ামের সংবাদপত্র লে সোয়ার জানিয়েছে, কয়েক ডজন দোকান ও সুপারশপ আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্পারের পাঁচটি দোকান, কিউ এইট সার্ভিস স্টেশনসংলগ্ন ‘শপ অ্যান্ড গো’ কনভিনিয়েন্স স্টোর এবং ডেলহেইজের কয়েকটি ছোট মিনি মার্কেট ‘প্রক্সি ডেলহেইজ’।
ডেলহেইজের হিমায়ন ব্যবস্থা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সাবকোবেলের প্রধান নির্বাহী স্টিফান মোলাঁ পত্রিকাটিকে বলেন, ‘আমরা রাত ১টা থেকে প্রযুক্তিবিদদের সক্রিয় করতে শুরু করি। সারা রাত ও সকাল পর্যন্ত আক্রান্ত স্থাপনাগুলো বিচ্ছিন্ন করেছি।’ বেলগা বার্তা সংস্থাকে তিনি নিশ্চিত করেন, এটি সাইবার হামলাই ছিল এবং যন্ত্রগুলোর ইভাপোরেটর ডিফ্রস্ট মোডে চলে গিয়েছিল।
কলরুইট ও ইন্টারমার্শে জানিয়েছে, তাদের যথাক্রমে পাঁচটি ও ১৫টি দোকানের ফ্রিজে প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। কারফুর বেলজিয়াম জানিয়েছে, তাদের ৭০০ দোকানের মধ্যে প্রায় ১৫টিতে সমস্যা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র মিখ ফেরগাওয়েন বলেছেন, ‘এটি সাইবার হামলা, এ ছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই।’
ইকিয়া বেলজিয়ামের এক মুখপাত্র এএফপিকে জানান, সাইবার হামলার কারণে তাদের মঁস শাখার ফ্রিজারের তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেছে। সতর্কতা হিসেবে কিছু খাদ্যপণ্য হিমায়ন যন্ত্র থেকে সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আশঙ্কা, এতে কিছু খাদ্য অপচয় হবে।
ফিনল্যান্ডের সংবাদপত্র হেলসিঙ্গিন সানোমাত জানিয়েছে, কেসকো সুপারশপ চেইনের দোকানগুলোয় একই ধরনের সমস্যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডাচ সরকারি বেতার এনওএস জানিয়েছে, নেদারল্যান্ডসে অন্তত ১৭টি দোকানের সিস্টেম আক্রান্ত হয়েছে, যেগুলোর বেশির ভাগই ছোট স্থানীয় দোকান।

এস্তোনিয়ার একটি সুপারশপ চেইনে হামলাকারীরা হিমায়ন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী একটি কম্পিউটারে ঢুকে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তুলে দিয়েছেন বলে ইআরআরকে জানিয়েছে হিমায়ন যন্ত্রের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিটম্যান কোল্ডটেক। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ইয়ান মুৎসো বলেন, ‘ঘটনাটি একেবারেই সাম্প্রতিক, আজ সকালেই ঘটেছে।’ তিনি জানান, কয়েক মিনিটের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি। সেলভার সুপারশপ চেইন জানিয়েছে, তাদের একটি শাখা আক্রান্ত হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের তৃতীয় বৃহত্তম সুপারশপ চেইন সুপারভ্যালু জানিয়েছে, তাদের ২২৩টি দোকানের মধ্যে ১৩টির একটি নির্দিষ্ট মডেলের হিমায়ন ব্যবস্থা সাইবার ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে। এসব দোকানে হিমায়িত ও ঠান্ডা পণ্য বিক্রি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সেন্টিনেলওয়ানের টম হেগেল বলেন, অনেক সাইবার হামলায় মুক্তিপণ দাবি করা হয় কিংবা এগুলোর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গোষ্ঠীও এ ধরনের হামলা চালাতে পারে। তবে সুপারশপের এসব হামলায় কোনো আর্থিক দাবি না থাকায় তিনি মনে করছেন, এগুলো নাশকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

হেগেল রয়টার্সকে বলেন, ‘খুচরা খাত সহজ লক্ষ্যবস্তু। কারণ, খুচরা চেইনগুলো বিপুলসংখ্যক হিমায়ন নিয়ন্ত্রক, বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, দরজার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ প্যানেল ও পয়েন্ট-অব-সেল যন্ত্র পরিচালনা করে।’
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ট্রিবিউটেকের প্যাট্রিক ল্যাম্পলমায়ার বলেন, পদ্ধতিটি ‘সস্তা এবং ক্ষতি তাৎক্ষণিক’ হওয়ায় হামলাকারীরা ‘কাজ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত’ চালিয়ে যাবে। তাঁর ভাষ্য, অনেক হিমায়ন ব্যবস্থায় এমন ত্রুটি আছে, যা আগে থেকেই জানা, কিন্তু এখনো ঠিক করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘ফ্রান্সের হামলার পরও হাজার হাজার নিয়ন্ত্রক ইন্টারনেট থেকে নাগালযোগ্য ছিল। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রকের কয়েকটি কমান্ডেই রাতারাতি মজুত পণ্য নষ্ট করে দোকান বন্ধ করে দেওয়া যায়।’
ফ্রান্সের হামলায় হ্যাকাররা প্রধানত ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান ড্যানফসের সরবরাহ করা নিয়ন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে ড্যানফস জানায়, গত বছরই তারা কিছু নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত করেছিল এবং গ্রাহকদের ‘দীর্ঘদিন ধরে’ হালনাগাদ ইনস্টল করার পরামর্শ দিয়ে আসছিল।
হ্যাকাররা দূর থেকে হাজার হাজার ফ্রিজ, ফ্রিজার ও ঠান্ডা রাখার ক্যাবিনেটের সেটিং বদলে ফেলে। ইন্টারমার্শে, কোঅপেরাতিভ উ, কারফুর, লেক্লের ও মনোপ্রিসহ বিভিন্ন চেইনে তাপমাত্রা মাইনাস ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৫০ ডিগ্রির বেশি পর্যন্ত তোলা হয়।
দোকানগুলোকে প্রচুর পরিমাণে তাজা মাংস, দুগ্ধজাত ও হিমায়িত পণ্য ফেলে দিতে হয়। বিভিন্ন সুপারশপের ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার ইউরো থেকে শুরু করে ১ লাখ ৩০ হাজার ইউরোর বেশি পর্যন্ত বলে জানা গেছে।
প্যারিসের প্রসিকিউটর কার্যালয় ফ্রান্সের হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ঁ লেকোর্নু দেশটির জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাকে (আনসি) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। সংস্থাটি পরে জানিয়েছে, অপর দুটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রক ব্যবহারকারী সুপারশপগুলোও ওই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। তবে হামলার পেছনে কারা থাকতে পারে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কিছু জানায়নি। এখন পর্যন্ত কেউ দায় স্বীকার করেনি।