প্রকাশ্যে ও আড়ালে সামরিক শাসনের পুনর্জাগরণ হচ্ছে

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর রাজনীতিতে আবারো পুনর্জাগরণ। গত এক দশকে এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। অন্যান্য স্থানেও বেসামরিক প্রশাসনে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ। এ অবস্থায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে নিউইয়র্কভিত্তিক মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক থিংকট্যাংক সংস্থা কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)।

এ অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে চলতি মাসেই একটি ডিসকাশন পেপার প্রকাশ করেছে সিএফআর। ‘দ্য রিভাইভাল অব মিলিটারি রুল ইন সাউথ অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া: ডেঞ্জারস টু দ্য রিজিয়নস ডেমোক্রেটিক ফিউচার’ শীর্ষক ওই পেপারে পর্যবেক্ষণ দিয়ে সিএফআর বলেছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গণতান্ত্রিক উত্তরণ গতিশীল হয় চলতি শতকের শুরুর দশকে। গত দশকের শুরু পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড ও পূর্ব তিমুরের মতো দেশগুলোর পরিবেশ পুরোপুরি গণতন্ত্রের অনুকূলে চলে যায়। তবে গত এক দশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির অবনমন হয়েছে বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাপী মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা নিয়ে ২০২১ সালে এক জরিপ চালায় ওয়াশিংটনভিত্তিক ফ্রিডম হাউজ। ওই সময় পূর্ব তিমুর ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আর কোনো দেশই গণতান্ত্রিকভাবে ‘মুক্ত’ রেটিংয়ের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গণতান্ত্রিক অবনমনের বিষয়টিকে আরো বড় পরিসরে বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখছে সিএফআর। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, গত দেড় দশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গোঁড়া জনতোষণবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। এরই ধারাবাহিকতায় অবক্ষয় ঘটেছে এখানকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রীতিনীতির অবক্ষয়ের। ফিলিপাইনে রদ্রিগো দুতার্তের মতো নেতারা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। বিশেষ করে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত মহামারী এ অঞ্চলের গোঁড়া নেতাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমগুলোর দ্রুত বিস্তার এখানে দ্রুত গুজব ছড়ানোর পাশাপাশি রাজনীতির গোঁড়া মেরুকরণে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে।

তবে এ অঞ্চলে গণতন্ত্রের পিছিয়ে পড়ার পেছনে বেসামরিক প্রশাসনে সামরিক হস্তক্ষেপকেই সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন সিএফআরের পর্যবেক্ষকরা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১০ বছর আগেও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশের সরকারে সামরিক বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ওই সময়ে দেশগুলোর বেসামরিক প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল ঠিকই। যদিও আপাতদৃষ্টিতে নিয়ন্ত্রণ ছিল বেসামরিক প্রশাসনের হাতে। কিন্তু বর্তমানে এসে দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলের দুই দেশ মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে প্রত্যক্ষভাবেই দেশ শাসন করছে সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনে সামরিক বাহিনী হয় আরো প্রভাবশালী হয়ে উঠছে নয় নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে চলে গিয়েছে। আঞ্চলিক এ প্রবণতার চূড়ান্ত প্রদর্শনী ঘটে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ওই সময় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী হয়ে ওঠার এ প্রবণতা এখন শুধু আঞ্চলিক নয় বৈশ্বিক রূপ নিচ্ছে বলে ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা এবং ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকির সংকলিত এক ডেটাবেজের তথ্যে উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, গত বছর বিশ্বব্যাপী সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা হয়েছে আগের পাঁচ বছরের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়ে বেশি। এর মধ্যেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়টি একটু বেশিই প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। কারণ দেশগুলো গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল।

সিএফআরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের ফলাফল প্রায়ই বিপর্যয়কর হয়ে দেখা যায়। যেকোনো দেশের সামরিক জান্তা বরাবরই গণতন্ত্রের পথে প্রত্যাবর্তনের পথকে যতটা সম্ভব বন্ধুর করে তুলতে চায়। এর ধারাবাহিকতায় রক্তপাত বাড়ে। সরকারের শাসন প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে ভয়ংকর। অথবা রাষ্ট্র হয়ে ওঠে আজকের মিয়ানমারের মতো ব্যর্থ। এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোয়ও সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা বেড়ে যায়। সার্বিকভাবে গোটা অঞ্চলেরই গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের ফলে প্রায়ই রাষ্ট্রীয় সহিংসতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যায়। জেঁকে বসে কর্তৃত্ববাদী শাসন। এমনকি গোঁড়া জনতোষণবাদী নেতার শাসনের চেয়েও এ কর্তৃত্বপরায়ণতার মাত্রা বেশি হয়ে থাকে। এখন পর্যন্ত প্রায় সব সামরিক সরকারই নিজেকে শক্তিশালী করতে গিয়ে দুর্বল অদক্ষ শাসনপ্রক্রিয়ার প্রদর্শন করে এসেছে। সব মিলিয়ে শাসনপ্রক্রিয়ায় সামরিক বাহিনীর প্রত্যাবর্তন গোটা আঞ্চলিক পরিমণ্ডলেই গণতন্ত্রকে কয়েক বছর পিছিয়ে দিয়েছে। প্রকোপ বাড়িয়েছে সহিংসতার। একই সঙ্গে ব্যাহত করেছে উন্নয়নকেও। অন্যদিকে সামরিক অভ্যুত্থান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের ঘটনায় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো সবসময়ই দুর্বল ও অকার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে এসেছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button