পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত ইরানের ‘ফোরডো’ পারমাণবিক কেন্দ্র, বাঙ্কার-বিধ্বংসী বোমাও যার কিছু করতে পারে না

পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত ইরানের ‘ফোরডো’ পারমাণবিক কেন্দ্র, বাঙ্কার-বিধ্বংসী বোমাও যার কিছু করতে পারে না

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের রহস্যময় ফোরডো জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র — পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি করে নির্মিত, বাঙ্কার-বিধ্বংসী বোমাও যার কিছু করতে পারে না। সম্প্রতি প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রগুলোতে এই পারমাণবিক স্থাপনাটির কয়েকটি সুড়ঙ্গ, এক বিশাল কাঠামো এবং নিরাপত্তা বলয় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

এই গোপন এবং কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত কেন্দ্রটি তেহরানের দক্ষিণে, পবিত্র শহর কোমের কাছে অবস্থিত। ২০০৯ সালে প্রথমবার এই কেন্দ্রের অস্তিত্ব প্রকাশিত হয়, এবং তখন থেকেই এটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে।

চুরি হওয়া নথিতে ফাঁস

ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা বহু বছর আগে চুরি করা গোপন ইরানি নথিপত্রের মাধ্যমে ফোরডোর প্রকৃত প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বহু তথ্য সামনে আসে। এসব নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ফোরডোর প্রধান হলগুলি ভূমির ৮০-৯০ মিটার গভীরে অবস্থিত — যা ইসরায়েলি বোমার নাগালের বাইরে। অর্থাৎ, আকাশপথে হামলা চালিয়ে এই কেন্দ্র ধ্বংস করা কার্যত অসম্ভব।

বোমা নয়, সম্ভবত আরেকটি পন্থা

ইসরায়েল এই কেন্দ্রটিকে একটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করলেও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA) বলছে, এখনো পর্যন্ত তারা এই কেন্দ্র ধ্বংসে আগ্রহী বা সক্ষম নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার বলেছেন, “বিশ্বে কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই এমন বোমা আছে যা দিয়ে ফোরডো ধ্বংস করা সম্ভব।” তবে তিনি আরও বলেন, “এই কেন্দ্র ধ্বংসের অন্য উপায়ও থাকতে পারে।”

২০০০ সালের গোড়ায় নির্মাণ শুরু

আইএইএ’র তথ্যমতে, ফোরডো প্রকল্পের নির্মাণকাজ ২০০২ সাল থেকে চলছিল, যদিও স্যাটেলাইট চিত্রে ২০০৪ সাল থেকে সেখানে কাঠামোগত উন্নয়নের চিহ্ন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (ISIS)’ এর প্রধান ডেভিড অ্যালব্রাইট বলেন, “ফোরডো প্রকল্পটি ২০০০ সালের শুরুর দিকে ইরানের গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির অংশ হিসেবে শুরু হয়।”

পারমাণবিক চুক্তি ও এরপর…

২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA)’ অনুসারে ইরানকে ফোরডো কেন্দ্রের অধিকাংশ সেন্ট্রিফিউজ ও পারমাণবিক উপাদান অপসারণ করতে হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে ইরান আবারো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়াতে শুরু করে।

IAEA জানিয়েছে, ফোরডোতে বর্তমানে ২,৭০০টিরও বেশি সেন্ট্রিফিউজ রয়েছে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের হার ৬০% ছাড়িয়ে গেছে। এই মাত্রার ইউরেনিয়াম অস্ত্র-গ্রেডে রূপান্তর করা তুলনামূলকভাবে সহজ, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

‘নয়টি বোমার জন্য যথেষ্ট’

আইসিস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের হিসেব মতে, “ইরান ফোরডোতে সঞ্চিত ৬০% ইউরেনিয়াম মাত্র তিন সপ্তাহে ২৩৩ কেজি অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করতে পারবে, যা নয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট।”

ধ্বংসযোগ্য কি না?

RUSI-এর বিশ্লেষণ বলছে, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের GBU-57 ‘Massive Ordnance Penetrator’ বোমাও ফোরডো পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম না, কারণ এটি সর্বোচ্চ ৬০ মিটার গভীরে আঘাত হানতে পারে। ফোরডোর হলগুলো রয়েছে তারও নিচে। এই বোমা বহন করা যায় কেবল B-2 স্টিলথ বোমারু বিমানে, যা ইসরায়েলের নেই।

বিকল্প পথ

সাবেক মার্কিন বিমানবাহিনীর কর্নেল ও CNN সামরিক বিশ্লেষক সেড্রিক লেইটনের মতে, “একাধিক আঘাতের মাধ্যমে টানেল প্রবেশপথ ও বায়ুচলাচল ব্যবস্থা ধ্বংস করা সম্ভব হতে পারে।” অ্যালব্রাইটও একমত, তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ সংযোগ ও ভেন্টিলেশন সিস্টেম ধ্বংস করলেও স্থাপনাটি অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।”

ফোরডো পারমাণবিক কেন্দ্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচির কেন্দ্রে থাকলেও এটি পুরো চিত্রের কেবল একটি অংশ। ইরান যদি সত্যিই গোপনে আরও সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করে থাকে এবং সেগুলোর অবস্থান অজানা থেকে যায়, তাহলে শুধু ফোরডো ধ্বংস করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।


তথ্যসূত্র: CNN, IAEA, ISIS, RUSI, ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা