নিজস্ব সংবাদদাতা : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের দাখিল করা নির্বাচনী হলফনামায় তাঁদের সম্পদ, আয়–ব্যয়, ঋণ ও মামলার বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। গাজীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন গাজীপুর–৫ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে দাখিল করা হলফনামায় জানিয়েছেন, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৯৮ হাজার ৩৬৮ টাকা। তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৩০ লাখ ৫৬৪ টাকা।
গত সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) মনোনয়নপত্রের সঙ্গে এই হলফনামা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
হলফনামা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভোটারদের সামনে প্রার্থীদের আর্থিক অবস্থান ও আইনগত পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
হলফনামা অনুযায়ী, ফজলুল হক মিলনের কাছে বর্তমানে নগদ রয়েছে ১৫ লাখ ২৫ হাজার ৮২৯ টাকা। ব্যাংকে জমা আছে ১৩ লাখ ২৬ হাজার ৩৪১ টাকা। এ ছাড়া তাঁর মালিকানায় রয়েছে ৫০ ভরি স্বর্ণালংকার। আসবাবপত্রের মূল্য দেখানো হয়েছে দেড় লাখ টাকা এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্য ৫০ হাজার টাকা।
হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর স্ত্রীর কাছে নগদ রয়েছে ২১ লাখ ৭১ হাজার ২০৩ টাকা এবং ব্যাংকে জমা আছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ২৪৮ টাকা। তাঁর স্ত্রীর মালিকানায় রয়েছে ২০০ তোলা স্বর্ণালংকার। এ ছাড়া ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার আসবাবপত্র এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক পণ্য রয়েছে।
স্বামী ও স্ত্রী—উভয়েরই আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ফজলুল হক মিলন তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসএস (মাস্টার্স) উল্লেখ করেছেন।
হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর বাইরে অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে আরও ৪৩টি মামলা ছিল। এসব মামলার মধ্যে কিছু স্থগিত রয়েছে, কিছুতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন, কিছু মামলায় অব্যাহতি পেয়েছেন এবং কিছু মামলা নিষ্পত্তি ও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পেশা হিসেবে তিনি ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন। ব্যবসা থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ১৫ লাখ ২৮ হাজার ৪০০ টাকা। বাড়ি বা সম্পত্তি ভাড়া থেকে আয় ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। অন্যান্য খাত থেকে আয় দেখানো হয়েছে ২৬ হাজার ১৬৪ টাকা।
শেয়ার, বন্ড বা সঞ্চয়পত্র থেকে আয়ের কোনো তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি।
হলফনামার তথ্যমতে, তাঁর কৃষিজমির পরিমাণ ২৮৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অকৃষিজমি ৫১ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
এ ছাড়া পূবাইলে ৪ হাজার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের একটি একতলা ভবন, বনানীতে একটি টিনশেড বাড়ি, কাকরাইলে ১ হাজার ৬৬৩ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং বসুন্ধরায় ১ হাজার ৪৭৪ বর্গফুটের ১ কোটি ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৭০০ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি।
হলফনামায় স্ত্রী ও সন্তানের কোনো আয়ের উৎস উল্লেখ না থাকলেও স্ত্রীর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৮ লাখ ১১ হাজার ৬০০ টাকা। তাঁর স্ত্রী বর্তমানে গৃহিণী।
স্ত্রীর মোট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৮৬ লাখ ৪৪ হাজার ৬২৩ টাকা। এছাড়াও রমনা সার্কুলার রোডে ১৮০ বর্গফুট একটি দোকান রয়েছে তার স্ত্রীর। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তিনি ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা আয়কর দিয়েছেন।
ফজলুল হক মিলনের নামে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ নেই। তবে তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে নেওয়া ৩০ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে ফজলুল হক মিলন নিজে ৫ লাখ ৯২ হাজার ৯২৬ টাকা আয়কর দিয়েছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
৬৩ বছর বয়সী এ কে এম ফজলুল হক মিলন বিএনপি থেকে এর আগে দুইবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, সংসদ সদস্য থাকাকালে গাজীপুর–৫ আসনের সার্বিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে তিনি ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি কালীগঞ্জ উপজেলার বরতুল গ্রামের বাসিন্দা।
রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, কালীগঞ্জ পৌরসভা ও উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন এবং গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়ন ও সিটি করপোরেশনের ৪০,৪১ ও ৪২ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গাজীপুর–৫ আসনটি জাতীয় সংসদের ১৯৮ নম্বর আসন।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৪৮ জন। হিজড়া ভোটার আছে ২ জন।
এখানে ১২৪টি ভোটকেন্দ্রের ৬৭৮টি কক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ফজলুল হক মিলনসহ মোট আটজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। অন্যরা হলেন, মো. খায়রুল হাসান (জামায়াতে ইসলামী), মো. আল আমিন দেওয়ান (ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ), কাজল ভূঞা (গণফোরাম), মো. আজম খান (জনতার দল), রুহুল আমিন (খেলাফত মজলিস), গাজী আতাউর রহমান (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) ও ডা. মো. সফিউদ্দিন সরকার (জাতীয় পার্টি)।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দাখিল করা হলফনামার তথ্য যাচাই করা হবে। কোনো প্রার্থী ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী হলফনামা ভোটারদের জন্য প্রার্থীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এসব তথ্য প্রকাশ সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করে।
উল্লেখ্য, তফসিল অনুযায়ী, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের সময় ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। আর ভোট গ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।