ইভ্যালির নতুন পরিচালনা পর্ষদ: গ্রাহকরা কি তাদের টাকা ফেরত পাবে?
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ইভ্যালিকে দেউলিয়া ঘোষণা না করে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার আদেশ দিয়েছেন আদালত। সেজন্য পরিচালনা পর্ষদও গঠন করে দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, তাতে কি ইভ্যালি রক্ষা পাবে? গ্রাহকরা কি তাদের টাকা ফেরত পাবেন?
কথিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির অনলাইন, অফলাইন সব ধরনের কার্যক্রম এখন বন্ধ আছে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে একজন গ্রাহকের রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দিয়েছেন। তারা এখন এই প্রতিষ্ঠানটি সচল করার চেষ্টা করবেন৷ পর্ষদের চেয়ারম্যান হলেন সাবেক বিচারপতি সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। পর্ষদের সদস্য হিসেবে আছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব মো. রেজাউল আহসান, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফখরুদ্দিন আহমেদ এবং ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ। পর্ষদের বাইরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিতে বলা হয়েছে অতিরিক্তি সচিব (ওএসডি) মাহবুব কবিরকে।
রিটকারীর পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম এম মাসুম জানান, ‘‘আদালত পরিচালনা পর্ষদকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন তার মধ্যে আছে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুদ্ধার বা পরিচালনা করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা। সম্ভব না হলে তাদের সম্পদের চেয়ে দায় যদি বেশি হয় তাহলে হয়তো এই প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করে যা সম্পদ আছে তা আনুপাতিকহারে পাওনাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। এই বিষয়টিও তারা দেখবেন।”
তিনি বলেন, ‘‘আদালত এজন্য ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত একটি সময় বেঁধে দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে তারা একজন অডিটর নিয়োগ করে তাদের সম্পদ কত আছে, দায় কত আছে, ব্যাংক এবং দেশের বাইরে কোনো সম্পদ বা অর্থ আছে কি না তা বের করবে। টাকা পাচার হয়েছে কি না, তাদের গ্রাহক, কার কত পাওনা, কে কত দিয়েছেন সব হিসাব চূড়ান্ত করতে বলা হয়েছে।”
এইসব হিসাব নিকাশের পরই পরিচালনা পর্ষদ ইভ্যালির ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালতকে জানাবে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এবং পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক জানান, তারা এখনো আদালতের আদেশ এবং তাদের কাজের টার্মস অব রেফারেন্স পাননি। তবে এরমধ্যে পেয়ে গেলে তারা সামনের সপ্তাহে প্রথম বৈঠকে বসবেন। তিনি বলেন, ‘‘আদালত যদি প্রতিষ্ঠানটি সচল করতে বলেন আমরা সেই চেষ্টা করব। প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক ব্যবসায় ফিরিয়ে এনে লাভজনক করার চেষ্টা করব। শর্ট টার্ম ও লং রানে পরিকল্পনা করব। লাভ যদি করা যায় তাহলে পাওনাদারদের পাওনা ধীরে ধীরে শোধ করার চেষ্টা করব। তবে তার আগে প্রতিষ্ঠানটির দায় দেনার হিসাব করে পরিকল্পনা করতে হবে।”
তিনি আরো জানান, ‘‘দেশের বাইরে সম্পদ পাচার হয়েছে কি না তাও দেখা হবে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সহায়তা নেব। আমাদের যে পর্ষদ করা হয়েছে সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। আশা করি ভালো কিছু করতে পারব।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু যদি সম্পদ না থাকে তাহলে কোম্পানি অবসায়ন করে আনুপাতিকহারে যা আছে তা ভাগ করে দেয়ার বিধান আছে।
অতিরিক্ত সচিব এবং ইভ্যালির নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব কবির বলেন, ‘‘এখনো কিছুই তো বুঝতে পারছিনা। ওদের চেয়ার টেবিল পর্যন্ত নাই। প্রত্যাশার কথা কী বলব?”
তবে তিনি মনে করেন, ‘‘হিসাব নিকাশ বের করা যাবে৷ তথ্য কোথায় যাবে? তথ্য আমরা পাবো। তবে সবার টাকা পরিশোধ করা যাবে এই চিন্তা বোকামি হবে। কারণ আমরা পকেট থেকেও টাকা দেব না, সরকারও টাকা দেবে না। তবে যা করব তা স্বচ্ছতার সাথে করব। বিশ্বাসের একটা জায়গা থাকবে। কোনো ম্যানিপুলেশন হবে না। আমরা যে পিকচার দেব তা সঠিক পিকচার-এই গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি।”
ইভ্যালির গ্রাহকদের সংগঠন ‘‘বাংলাদেশ ই-কমার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসেসিয়েশন।” তারা জানায়, প্রতিষ্ঠানটির অ্যাাকটিভ গ্রাহক ৩৫ লাখ। আর মোট গ্রাহক ৭০ লাখের বেশি। তাদের জানা মতে, গ্রাহকদের পাওনা আছে ৫০০ কোটি টাকা।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাকিব হাসান বলেন, ‘‘হাইকোর্ট যে পরিচালনা পর্ষদ করে দিয়েছেন এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। আমাদের দাবি প্রতিষ্ঠানটি যাতে চলে এবং গ্রাহকরা যাতে তাদের পাওনা টাকা বা পণ্য পান। সেটা করতে হলে ইভ্যালির এমডি মো. রাসেলকে কারাগার থেকে বাইরে এনে নজরদারিতে রেখে তার মাধ্যমেই ব্যবসাটি পরিচালনা করা। সেটা করা হলে আমাদের বিশ্বাস আমরা আমাদের টাকা ফেরত পাব, পণ্য পাব।”
কিন্তু বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যাণ্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস বা বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর মনে করেন এই প্রতিষ্ঠানকে আর কার্যকর করা বা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘‘সাবেক বিচারপতি, সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী দিয়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবভিত্তিক নয়। এই বিষয়ে যারা এক্সপার্ট তাদের দিয়েও ইভ্যালিকে আর রান করানো সম্ভব বলে আমি মনে করিনা।”
তার মতে, ‘‘ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রথমে লাভ না করে ক্ষতির মধ্য দিয়েই এগোয়। সেই কারণে অ্যামাজনকেও লাভ করতে ২০ বছর লেগেছে। কিন্তু তাদের বিশাল বিনিয়োগ ছিল৷ আর ইভ্যালির এখনই ঘোষিত দায় এক হাজার কোটি টাকা। অঘোষিত দায় হবে তিন হাজার কোটি টাকা। এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে এখন খুব বড় বিনিয়োগ লাগবে। এই প্রতিষ্ঠানে সেই বিনিয়োগ কে করবে?”
প্রতারণার অভিযোগে ইভ্যালির এমডি মো. রাসেল এবং তার স্ত্রী ও চেয়ারম্যান শামিমা নাসরিনকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। তারা এখন কারাগারে আছেন৷ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের চেয়ে দায় ছয় গুণেরও বেশি৷ তখন সম্পদের পরিমাণ ৬৫ কোটি ১৭ লাখ আর দায় ৪০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা বলা হয়েছিলো। তবে পরে বিভিন্ন তদন্তে এই দায় এক হাজার কোটি টাকা বলা হয়। তাদের দায় শুধু গ্রাহকদের কাছে নয়, যদের কাছ থেকে পণ্য নেয় তাদের কাছেও।
সূত্র: ডয়চে ভেলে



