জামিন অযোগ্য অপরাধ গণ্য হবে বিপন্ন প্রাণী হত্যা
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গত ১৭ বছরে দেশে মানুষের হাতে ৯০টি হাতির মৃত্যু হয়েছে আর সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমতে কমতে এখন ১১৪টিতে এসে নেমেছে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে হাতি ও বাঘ হত্যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তার পরও রক্ষা করা যাচ্ছে না তাদের। তবে এবার বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা সব বিপন্ন প্রাণী হত্যা শাস্তিযোগ্য এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে আইনটি সংশোধনের কাজ চলছে।
এ আইন পাস হলে হাতি ও বাঘের পাশাপাশি চিতা বাঘ, লামচিতা, উল্লুক, সাম্বার হরিণ, কুমির, ঘড়িয়াল, তিমি বা ডলফিন, পরিযায়ী পাখির মতো আরো যেসব বিপন্ন বন্যপ্রাণী রয়েছে, সেসব হত্যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সেক্ষেত্রে বিপন্ন হিসেবে ঘোষিত প্রাণী হত্যায় সাত বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধানও থাকবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, হালনাগাদ তালিকায় থাকা বিপন্ন বন্যপ্রাণী হত্যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে আইন সংশোধনের কাজ চলছে। আইনটি পাস হলে হাতি ও বাঘের মতো অন্যান্য বিপন্ন প্রাণী হত্যাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এক বৈঠকে সব ধরনের বিপন্ন প্রাণী হত্যা শাস্তিযোগ্য এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রতিবেদন দেয়া হয়। সেখানে বলা হয়, অন্যান্য বিপন্ন প্রাণী হত্যা শাস্তিযোগ্য এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ সংশোধনের কাজ চলমান রয়েছে।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২-এর ৩৬ নং ধারায় দেশের বিপন্ন বন্যপ্রাণী বাঘ ও হাতি হত্যায় সাজার কথা উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ধারা ২৪-এর অধীনে লাইসেন্স গ্রহণ না করে তফসিল ১-এ উল্লেখিত কোনো বাঘ বা হাতি হত্যা করলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন। এ অপরাধের জন্য সর্বনিম্ন দুই বছর এবং সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেঞ্জারড স্পেসিস অব ওয়াইল্ড ফোনা অ্যান্ড ফ্লোরা (সিআইটিইএস) এবং কনভেনশন অন দ্য কনজারভেশন অব মাইগ্রেটরি স্পেসিস অব ওয়াইল্ড অ্যানিমেলসে (সিএমএস) স্বাক্ষরকারী দেশ। বিপন্ন বন্যপ্রাণীর বৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অবৈধ বাণিজ্য প্রতিরোধ করতে দেশ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিপন্ন প্রাণীর বিলুপ্তির ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য আইনের এ সংশোধনী প্রণয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে এবং প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে শাস্তির বিষয়গুলো সবাইকে অবহিত করার আহ্বান জানান তারা। এমনকি বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে হাতি ফসলের কোনো ক্ষতি করলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিধান থাকার তথ্যও ব্যাপকভাবে প্রচার করা উচিত বলে মন্তব্য তাদের।
গত বছরের ৯ নভেম্বর শেরপুরের গারো পাহাড়ের সীমান্তঘেঁষা মালাকোচা এলাকায় একটি মরা হাতি উদ্ধার করেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। প্রাথমিক তদন্তে মালাকোচা গ্রামের কয়েকটি সবজিবাগানের সঙ্গে সংযোগ দেয়া বৈদ্যুতিক জিআই তারের সঙ্গে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে হাতিটি মারা যায় বলে সত্যতা পাওয়া যায়। পরে বন বিভাগ, শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ী রেঞ্জ কর্মকর্তা বাদী হয়ে গত ১৮ নভেম্বর ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের ৩৬-এর (১) ধারায় চারজনের বিরুদ্ধে শেরপুরের বন আদালতে হত্যা মামলা করেন। হাতি মৃত্যুর ঘটনায় সেটি ছিল প্রথম হত্যা মামলা। এরপর গত বছরের ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে হাতি হত্যার দায়ে বাবা-ছেলেকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। দেশে প্রথম হাতি হত্যার দায়ে দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার বিবরণীতে জানা গেছে, গত ৩০ নভেম্বর বাঁশখালীর লটমনিতে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে হাতিটিকে হত্যা করেন তারা। পরে তারা হাতিকে মাটিচাপা দেন। পরবর্তী সময়ে বন বিভাগ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও বিপন্ন বন্যপ্রাণী বিশেষ করে হাতি হত্যার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেই বৈঠকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য বেগম খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন বলেন, সম্প্রতি অনেকগুলো হাতি মারা গেছে। অবৈধ দখলদারদের মাধ্যমে হাতির করিডোর জবরদখল হয়ে যাওয়ায় হাতি লোকালয়ে চলে আসে। পরে মানুষের ক্ষেতের ধান এবং গোলার ধান খেয়ে ফেলে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী হাতিকে সুরক্ষা দেয়া আমাদের দায়িত্ব। বৈঠকে বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী হাতি ও বাঘ হত্যা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বৈদ্যুতিক তার দিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করে হাতি মারার বিষয়ে মামলা হয়েছে।
সেই বৈঠকে বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোস্তফা কামাল জানান, হাতির খাবারের জায়গা সৃষ্টি করার বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। খাবারের ব্যবস্থা হলে হাতি সাধারণত লোকালয়ে আসে না। এছাড়া হাতি যদি লোকজনের ফসলের ক্ষতি করে, তাহলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধানও আছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেন, আগে এত হাতি মারা যায়নি। এটি বন্ধ করা প্রয়োজন। বৈদ্যুতিক তার দিয়ে হাতি মারা প্রতিরোধে বন বিভাগ থেকে সম্প্রতি চারটি প্যাট্রোল টিম তৈরি করে জনগণকে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়েছে। হাতি ধান খেয়ে ফেললে কৃষকরা যে ক্ষতিপূরণ পাবেন, তা অনেকেই জানেন না। বিষয়টি প্রচার পেলে এবং শাস্তির বিষয়টি জানলে অনেকেই সহজে হাতি মারতে যাবে না।
সূত্র: বণিক বার্তা



