দিনে নয় রাতে নিজ বাসায় বসে দাপ্তরিক কাজ করেন বরিশালের মেয়র
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর। নিয়মিত অফিস করেছেন কয়েক সপ্তাহ। এরপর তিন বছর ধরে বেশির ভাগ দিনই সিটি করপোরেশনের দাপ্তরিক কাজগুলো করছেন রাতের বেলায় নিজ বাসায় বসে।
নগর ভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, বর্তমান মেয়র অফিস করেন না। ফাইল সই করানোর জন্য বাসায় ডাকেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি দেখা করেন। কোনো কোনো দিন দেখা না করেই সাক্ষাত্প্রার্থীদের ফিরিয়ে দেন তিনি।
বরিশাল নগর ভবনের অন্তত ১৫ জন কর্মকর্তা জানান, মেয়রের এপিএস ও শ্যালক মো. মোস্তফা জামান মিলন সন্ধ্যার পর যেকোনো সময় ফোন করে মেয়রের বাসায় ডাকেন। সন্ধ্যা ৮টা-৯টার মধ্যে মেয়রের বাসায় গেলে তিনি দেখা করেন রাত ৩টার পর। বিসিসির কর্মকর্তাদের অধিকাংশ রাতই কেটে যায় মেয়রের বাসার সোফায় শুয়ে।
বর্তমানে চাকরি নিয়ে অনেকটা আতঙ্কের মধ্যেই কাজ করছেন বরিশাল নগর ভবনের কর্মীরা। তারা জানান, বিসিসিতে এখন কথায় কথায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। এখন পর্যন্ত নগর ভবনের ৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ওএসডি এবং ২৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেছেন মেয়র।
তাদেরই একজন বিসিসির সহকারী প্রকৌশলী জহিরুল হক। নগর ভবনের কর্মীদের ভাষ্যমতে, নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদারদের কাছে বিল করায় চাকরিচ্যুত হয়েছেন তিনি। ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিসিসির গাড়ি ভাড়া ও গাড়ির তেলের টাকা পরিশোধের দাবি তোলায় চাকরি হারিয়েছেন তিনি। ঠিকাদাররা এ বিষয়ে ‘অভিযোগ’ তুললে মেয়র তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, দুবার বিল করার কারণ কী? জবাবে জহিরুল হক বলেছিলেন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব যান ব্যবহার করতে হলে যানের ভাড়া ও তেলের জন্য অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা দেয়ার নিয়ম রয়েছে। এরপর মেয়রের ‘কথার ওপর কথা বলার’ অভিযোগে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
একইভাবে একজন স্টোর ইনচার্জকেও বিনা কারণে পদাবনতি দেয়ার অভিযোগ করেছেন বরিশাল নগর ভবনের কর্মীরা। বর্তমানে তিনি বধ্যভূমির পরিদর্শক। এ বিষয়ে দেখা করতে গেলে কোনো কথা বলতে রাজি হননি তিনি।
তবে এত কড়াকড়ির মধ্যেও সেবাপ্রার্থীবান্ধব হয়ে ওঠেনি বরিশাল নগর ভবন। বরং তা হয়ে উঠেছে নাগরিক ভোগান্তির বড় কেন্দ্র। নিয়ম অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধনের কাজ ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে নগর ভবনে। একসঙ্গে ৩০ ওয়ার্ডের জনগণের জন্ম নিবন্ধনের কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিসিসির এনেক্স ভবনে সরেজমিন দেখা যায়, জন্ম নিবন্ধনের কাজের জন্য আসা মানুষজনের অভিযোগ ব্যাপক। স্থানীয় গণপূর্ত অফিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, এক মাস হলো জন্ম নিবন্ধনের জন্য ঘুরছি। কিন্তু এখনো আবেদনের কাগজই জমা দিতে পারিনি।
আরেক ভুক্তভোগী নারী এসেছেন পলাশপুর মাঠবাড়ি থেকে। তিনি বলেন, তিন মাস ঘুরে জন্ম নিবন্ধন পেয়েছি। কিন্তু লিঙ্গ লিখে রেখেছে ভুল। সেটা ঠিক করার জন্য দুই সপ্তাহ ধরে ঘুরছি।
এভাবে বারবার আসা-যাওয়া করতে গিয়ে অর্থ ও সময়ের ক্ষতি হচ্ছে সেবাপ্রার্থীদের। যদিও ৫-১০ হাজার টাকা খরচ করলে জরুরি ভিত্তিতে মিলে যাচ্ছে জন্ম নিবন্ধন। দুই মাস ঘুরেও ছেলের জন্ম নিবন্ধনের কাগজ জমা দিতে পারেননি ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম (ছদ্মনাম)। কিন্তু ৭ হাজার টাকার চুক্তিতে এক সপ্তাহেই জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন করেন তিনি। তিনি বলেন, এনেক্স ভবনে বহু ঘোরাঘুরি করেও কাগজই জমা দিতে পারিনি। এক কম্পিউটার অপারেটর জানালেন, ১০ হাজার টাকা দিলে এক সপ্তাহের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করে দেবে। খুব জরুরি ছিল বলে ৭ হাজার টাকায় জন্ম নিবন্ধন করতে বাধ্য হই।
অতিরিক্ত টাকা নিয়ে জন্ম নিবন্ধনের কাজের বিষয়টি স্বীকার করে একজন কম্পিউটার অপারেটর বলেন, এত মানুষের কাজ একসঙ্গে করতে গিয়ে মাথা ঠিক থাকে না। দুর্ব্যবহারও করে ফেলি অনেকের সঙ্গে। কেউ জরুরি ভিত্তিতে জন্ম নিবন্ধন করতে চাইলে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে তা করে দিই।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মো. ফারুক জানান, জন্ম নিবন্ধনের কাজ মূলত ওয়ার্ড কাউন্সিলরের। কিন্তু ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট না থাকায় এ কাজ এখন নগর ভবন থেকে করা হয়। তিনি বলেন, এরই মধ্যে সব ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি তাদের কার্যালয় থেকে জন্ম নিবন্ধনের কার্যক্রম চালু করার ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য।
তবে কাউন্সিলররা জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। ২৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শরীফ মোহাম্মাদ আনিছুর রহমান আনিছসহ অন্তত চারজন কাউন্সিলর বলেন, সিটি করপোরেশন আমাদের বলেছে, নিজ অর্থায়নে কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদের হাতে জন্ম নিবন্ধনের দায়িত্ব দেয়া হবে। কিন্তু এসব তো নগর ভবন থেকে করে দেয়ার কথা। কাউন্সিলররা ওই সব ইকুইপমেন্টের ব্যবস্থাও করেননি, আর তাদের হাতে জন্ম নিবন্ধনের দায়িত্বও অর্পিত হয়নি।
বিসিসিতে নতুন ভবনের অনুমোদনের জন্যও নানা ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ জানিয়েছে নগরবাসী। বর্তমানে ৩ শতাংশ জমির ওপর বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয় না নগর ভবন থেকে। সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ জমির ওপর ভবন নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্ল্যান পাস করানোর জন্য কয়েকটি দপ্তরে ঘুরতে হয়। প্রতিটি দপ্তরে একাধিক সেট কাগজ, প্ল্যানের প্রিন্টেড কপি (মূল) দেখানোর পরও প্ল্যান পাস হয় না। একজন ভুক্তভোগী জানান, এখন পর্যন্ত ২ লাখ টাকা চলে গেছে প্ল্যানই পাস করাতে পারলাম না।
এছাড়া নগরীর বেশকিছু এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত কর বাড়ানোর অভিযোগও করেছেন নগরবাসী।
সার্বিক বিষয়ে বিসিসির মেয়রের বক্তব্য নেয়ার জন্য বুধবার দুপুরে অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। মেয়রের শ্যালক ও এপিএস মোস্তফা জামান মিলন মেয়রের পক্ষে বলেন, নাগরিক ভোগান্তির বিষয়ে প্রধান নির্বাহীর বক্তব্যই মেয়রের বক্তব্য।
মেয়রের দিনে অফিস না করে রাতে অফিস করার বিষয়টি অস্বীকার করে এপিএস বলেন, একজন মেয়র অফিস না করে থাকেন কীভাবে? তিনি নিয়মিতই অফিস করেন।
সূত্র: বণিক বার্তা



