গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ২০১৬ সালের এক বিকাল। ইউসুফা সুসো তখন দুই বন্ধুর সঙ্গে ইতালির সিসিলি দ্বীপের রাজধানী পালেরমোর বাঁধানো রাস্তা ধরে হাঁটছিলেন। হঠাৎ সিসিলি কোসা নস্ট্রা মাফিয়াদের সঙ্গে যুক্ত একজন স্থানীয় অপরাধী ইমানুয়েল রুবিনো তাকে অপমান করে বলে, এটা আমার রাস্তা। রুবিনো তাদের ওই পথ থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
গাম্বিয়া থেকে আসা ২১ বছর বয়সী সুসোর মনে তখন একটু দুশ্চিন্তার উদয় হয় বটে। কিন্তু সঙ্গে তো দুজন বন্ধু আছেই। তাহলে রুবিনো আর কিইবা ক্ষতি করতে পারবে? কিছুক্ষণ পরের ঘটনা, রুবিনো আরো কয়েকজন সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে সুসোর পথ রোধ করে দাঁড়ায়। প্রাণভয়ে ছুটতে শুরু করেন সুসো। একসময় তাকে ধরে ফেলে রুবিনো। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রুবিনোর হাতে সুসোর দিকে তাক করা একটি বন্দুক, হঠাৎ সেখান থেকে বের হয় গুলি। সরাসরি গিয়ে সুসোর মাথায় আঘাত করে ওই বুলেট। অলৌকিকভাবে সেটা গেঁথে যায় সুসোর মস্তিস্কে, তবে চূড়ান্ত ক্ষতি না করেই। ফলে তিনি চলে যান কোমায়। ওই গোলাগুলির কয়েক মাস পরে সুসো বলেন, এখনো সবসময় ব্যথা অনুভব করি। গান গাওয়া আর ফুটবল খেলার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি, অস্বস্তি ছাড়া বেশিক্ষণ হাঁটতেও পারেন না।
এ ঘটনা বেশ নাড়া দেয় পালেরমোর অভিবাসী দোকানিদের। তারা ভাবতে শুরু করেন কয়েক দশকব্যাপী মাফিয়া নিয়ন্ত্রিত এ শহরে একদম ভিন্নরকম কিছু করার। দোকানিদের মনে হয়, কোনো পদক্ষেপ নেয়ার এটাই সময়, তা না হলে সবাইকে একদিন মরতে হবে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব পেছনে ফেলে অবশেষে তারা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় মাফিয়াবিরোধী সংগঠন অ্যাড্ডিওপিজ্জোর সহায়তায় ১১ জন দোকানি পালেরমো পুলিশের কাছে যান। তাদের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশী আর একজন তিউনিসিয়ার। পরিবর্তনটা আনতে সক্ষম হন তারাই।
আড্ডিওপিজ্জো নামের ওই দলের লক্ষ্য ছিল সিসিলিকে মাফিয়া-চাঁদাবাজ চক্রের হাত থেকে রক্ষা করা, যারা স্থানীয় ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করত এবং তাদের কারণে পুরো অভিবাসী দোকানিরা আতঙ্কগ্রস্ত থাকত। পরবর্তী সময়ে সালভো কারাডোনা নামের একজন আইনজীবী ১১ জনের এ দলকে পরামর্শসেবা দেন। তারাই পরে পুরো বিষয়টি আদালতে নিয়ে যায়। সংস্থাটির মন্তব্য, তাদের কার্যক্রম খুব তাত্পর্যপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশীরা তখন এমন কিছু করতে চেয়েছিল, যা বেশির ভাগ ইতালীয় করার কথা ভাববেন না। তাছাড়া একজনের একক অভিযোগের তুলনায় এমন সমন্বিত পদক্ষেপ উপেক্ষা করা বা পদক্ষেপগ্রহণকারীদের ভয় দেখানো সহজ নয়।
মাফিয়ারা ডাকাতি, চুরি, হামলা, হয়রানি এবং ক্রমাগত টাকা চাওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল। পালেরমোয় বসবাসকারী বাংলাদেশীরা অনেক বছর ধরে এসব অপরাধের শিকার হয়েছেন। হত্যাচেষ্টার ঘটনায় শুধু রুবিনোকে আটক করা হয় তা-ই নয়, তার পরিবার ও সহযোগী আরো নয়জনকে আটক করা হয়, যারা চাঁদাবাজিতে সাহায্য করত। শহরের বাল্লারো বাজারে চাঁদাবাজির সময়ে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশী সম্প্রদায়। ২০১৯ সালের নভেম্বরে পালেরমোর কোর্ট অব আপিল সুসোকে গুলি করার দায়ে রুবিনোকে ১২ বছরের সাজা দেন। পরের বছরের এপ্রিলে একজন বিচারক গ্রেফতার হওয়া রুবিনোসহ বাকি আটজনকে চাঁদাবাজি, মাফিয়া কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা, দোকানিদের প্রতি বর্ণবাদী বৈষম্য দেখানোয় ৬০ বছরের কারাদণ্ডের সাজা দেন। আদালত দোকানিদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারও ফিরিয়ে দেন।
ওই মামলা চলাকালে অভিযোগকারী কারো নামই প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু রায় ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরে দোকানিরা আবার সামনে এগিয়ে আসেন। নাম গোপন করে তারাই শোনান কীভাবে তারা মাফিয়াদের সঙ্গে লড়ে জয় ছিনিয়ে আনে—সেই ইতিহাস।
বাল্লারো পালেরমোর সবচেয়ে পুরনো বাজার। বাল্লারো বাজারের কেন্দ্রে প্রবেশ করতেই নানা ধরনের খাবার যেমন অ্যারানসিনি, ফ্রাইড সার্ডিনের গন্ধ আপনার নাকে এসে লাগবে। কিন্তু এর পাশাপাশি এ বাজারের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। সেখানে তরুণ সিসিলিয়ানরা নানা ধরনের সন্দেহজনক প্যাকেজ ফেরি করে বেড়ায়, নাইজেরিয়ান গ্যাং পতিতালয় চালায়। কয়েক দশকব্যাপী অবহেলার শিকার ছিল এ অঞ্চল। পাশাপাশি ছিল পুরোপুরি মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি ক্রমবর্ধমান অভিবাসীরাই শুরু করে সিসিলির এ জায়গাকে কিছুটা পরিবর্তন করতে।
ইতালিতে বেশির ভাগ অভিবাসী পৌঁছান উত্তর আফ্রিকা থেকে। এ পথে মৃত্যুবরণও করেন অনেকে। কিন্তু বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকেও যে অনেক মানুষ এ পথ পাড়ি দেয় তা প্রায় উপেক্ষিত থেকে যায়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, পালেরমোয়ে ১০-১৫ হাজার বাংলাদেশীর বাস। সেখানে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হন তারা। অনেক বছর ধরেই মাফিয়াসংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির মুখে পড়ছিলেন তারা। তেমনই একজন তাফাজ্জল তপু (ছদ্মনাম)। পালেরমোয়ে বেড়ে ওঠা এ তরুণ একজন বাংলাদেশী অ্যাক্টিভিস্ট। তিনি জানান, টাইটনিট সম্প্রদায়ের কেউই এসব চাঁদাবাজির বিষয়ে কথা বলত না, কারণ সবাই খুব ভীত ছিল। মানুষ সবসময় নিশ্চুপ থাকত এবং চাঁদাবাজির টাকা দিয়ে দিত, যেন তাদের দোকানে ডাকাতি করা না হয়।
আরেক বাংলাদেশী দোকানির নাম জয়নাল মিয়া (ছদ্মনাম)। বছরের পর বছর মাফিয়াদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সন্ত্রাসীদের ভয়ে জীবনযাপন করেছেন তিনি। তিনি রুবিনোকে একজন অপরাধী কিশোর থেকে বড় হতে হতে দিনের আলোয় জনসম্মুখে হত্যা করতে পারে, এমন এক মাফিয়া হয়ে উঠতে দেখেছেন। স্থানীয় বাল্লারো মাফিয়াদের কাছ থেকে দোকানে ডাকাতি করার ও হত্যার হুমকি পেয়েছেন। কিন্তু সেসব হুমকির বিষয়ে কথা বলতে বা পুলিশের কাছে যেতে তার ভয় ছিল তীব্র। জয়নাল মিয়া তার ছোট মেয়েটিকে নিয়েও এ পথে হাঁটতে ভয় পেতেন। তিনি বলেন, তাই মেয়ে যখন জানতে চাইত, আমি কেন তাকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছি না। তখন সত্যি বলার সাহস আমার ছিল না।
আবার শুধু টাকা দিলেই যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে, তেমনও নয়। সেটাই ছিল বড় সমস্যা। তাই আলী (ছদ্মনাম) নামের আরেক বাংলাদেশী বলছিলেন, তিনি সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে দেশে চলে আসার কথা ভাবছিলেন। পরিস্থিতি নতুন করে ভাবতে শেখায় সুসোর ওপর গুলির ঘটনার পরই। জয়নালের বিশ্বাস ছিল, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। এখন হয় সামনে এগোতে হবে অথবা মরতে হবে। তাই পুরো বিষয়টা নিজের হাতে তুলে নেবেন বলেই সিদ্ধান্ত নেন জয়নাল। বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের হয়ে মুখ খোলার কথা ভাবেন তিনি। তখনই অন্যান্য দোকানির সঙ্গে মিলে পদক্ষেপ নেন মাফিয়ামুক্ত হওয়ার। হত্যাচেষ্টা ও চাঁদাবাজির দায়ে রুবিনোকে গ্রেফতার করার পর আরো বেশি আশার আলো দেখতে পান জয়নালরা। তারপর যখন তারা দেখলেন আইন ঠিকভাবে কাজ করছে, তখন সাহস আরো বাড়ে। পরে একত্রিত হন জয়নাল ও আলী, সব তথ্য আদান-প্রদান করেন এবং আড্ডিওপিজ্জোর সহায়তা চান।
২০১৭ সালের শেষ দিকে যখন এ ঘটনায় করা মামলা সমাপ্তির দিকে, সে সময়টা বাংলাদেশী দোকানিদের জন্য সবচেয়ে কঠিন। কারণ তখন সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে ওই ঘটনার সাক্ষ্য দিতে হতো। এর অর্থ ছিল দোকানিদের পুরোপুরি রুবিনো ও তার সহযোগীদের মুখোমুখি হতে হতো। যেহেতু তারা সবাই একে-অন্যকে চিনত, ফলে বিষয়টা খুব ভীতিকরই ছিল বলে উল্লেখ করেন আড্ডিওপিজ্জোর পরামর্শক আইনজীবী কারাদোন্না।
কিন্তু এ মামলাকে ইতালিতে থাকা বাংলাদেশী দোকানিরা একটি যুদ্ধ হিসেবেই নিয়েছিল। কারণ তারা জানত, এখানে হেরে যাওয়ার মানে দোকান বন্ধ করে দিতে হবে এবং দেশে ফিরে যেতে হবে। অবশ্য ওই মামলার পরে পরিস্থিতি বদলে যায়। সেখানে থাকা সিসিলিয়ান দোকানিদের কাছ থেকেও তেমন সমর্থন পাননি বাংলাদেশীরা। জয়নাল বলেন, ওরা হয়তো মনের দিক থেকে আমাদের পাশে ছিল, কিন্তু কেউ মুখে কিছু বলতে পারত না।
ইতালির রাজনৈতিক পরিবেশও ভঙ্গুর। তবে বাংলাদেশী দোকানিদের করা ওই মামলার রায়ের প্রভাব ছিল প্রবল। সিসিলির কোসা নস্ট্রা মাফিয়ারা কখনো কখনো দেশটির বিশেষ ব্যক্তিদের হুমকি দিত, আবার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটত। এরই অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালের ২৩ মে ম্যাজিস্ট্রেট জিওভান্নি ফ্যালকোনকে বোমা হামলা চালিয়ে হত্যা করে এসব মাফিয়ারা। তাতে তার স্ত্রী ও তিনজন পুলিশ সদস্যও মৃত্যুবরণ করেন। এর ঠিক দুই মাস পরে ওই ম্যাজিস্ট্রেটের বন্ধু ও মাফিয়াবিরোধী আরেক ম্যাজিস্ট্রেট পাওলো বোরসেল্লিনোকেও পালেরমোয়ে বোমা হামলায় হত্যা করা হয়।
সুসোর ঘটনার পর জয়নালদের পদক্ষেপের জন্যই পুরোপুরি শান্ত হয়ে গেছে পালেরমো। তিনি বলেন, আমার সন্তানদের জন্য এখন আর কোনো ভয় নেই। এখন আমি বাল্লারোতে কোনো দ্বিধা ছাড়াই যেতে পারি আর মেয়েকেও স্কুলে নিয়ে যেতে পারি।
সূত্র: ইউরোপিয়ান প্রেস প্রাইজ ডটকম