ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর পরিকল্পনা ও রাশিয়াকে ৫০ দিনের আল্টিমেটাম ট্রাম্পের

সিএনএন : সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে চাপ দিতে দুটি নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনকে নতুন অস্ত্র সহায়তা এবং রাশিয়া শান্তিচুক্তিতে না এলে তাদের ওপর অর্থনৈতিক শাস্তি আরোপের হুমকি। এই উদ্যোগ ট্রাম্পের রাশিয়ার প্রতি হতাশার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই দুটি পদক্ষেপ ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের পূর্বের অবস্থানের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ট্রাম্প এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে আসছিলেন। তবে এবার তিনি প্রকাশ্যে জানালেন, যুদ্ধ বন্ধে তার আগের উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়েছে এবং এখন অস্ত্রই ইউক্রেনকে রক্ষা করতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করেছিলাম অন্তত চারবার আমাদের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু এটা বারবার পেছাচ্ছে।”
নতুন পরিকল্পনা কী?
ট্রাম্প যে পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তাতে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কিনবে এবং তা ইউক্রেনকে হস্তান্তর করবে। এটি গত বছরের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে থেকেই আলোচনায় ছিল। ইউরোপীয় নেতারা তখনই এমন বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছিলেন, যদি ট্রাম্প তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইউক্রেনকে সরাসরি সহায়তা কমিয়ে দেন।
হোয়াইট হাউসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প এই পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। একইসাথে তিনি রাশিয়াকে ৫০ দিনের সময় বেঁধে দেন, এই সময়ের মধ্যে শান্তিচুক্তিতে না পৌঁছালে ট্রাম্প ১০০% শুল্ক আরোপসহ কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।
“আমরা খুবই কড়া শুল্ক বসাতে যাচ্ছি যদি ৫০ দিনের মধ্যে শান্তি না হয়,” ট্রাম্প বলেন। “এগুলোকে আপনি সেকেন্ডারি ট্যারিফ বলতে পারেন। জানেন এর মানে কী।”
একজন হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা জানান, “সেকেন্ডারি ট্যারিফ” বলতে ট্রাম্প বোঝাতে চেয়েছেন, রাশিয়ার ওপর সরাসরি ১০০% শুল্ক এবং সেইসব দেশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা যারা রাশিয়ার তেল কেনে।
পুতিনের প্রতি ক্ষোভ
ট্রাম্প বলেন, “পুতিনের সঙ্গে আমার আলাপ খুবই ভদ্র ছিল, কিন্তু রাতেই আবার মিসাইল হামলা হয়।” যদিও তিনি দাবি করেন, পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টরা যেমন ক্লিনটন, বুশ, ওবামা ও বাইডেন—তাদের মত তিনি ‘ধোকা খাননি’।
অস্ত্র সহায়তার পরিধি
এই নতুন পরিকল্পনার অধীনে ইউরোপীয় দেশগুলো যেমন জার্মানি, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন এবং নরওয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাউইটজার কামান, স্বল্পপাল্লার মিসাইল, মাঝারি পাল্লার এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল এবং সর্বোপরি প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম কিনবে ও তা ইউক্রেনকে দেবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যাট্রিয়ট সিস্টেম সরবরাহ ইউক্রেনের জন্য একটি বড় জয়। এই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনীয় শহরগুলোর বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ট্রাম্পের কৌশলগত ভাবনা
ট্রাম্প চান, ইউরোপীয় দেশগুলো অস্ত্র কিনলে সেটি যেন তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন হিসেবে না দেখা হয়, কারণ এতে সরাসরি মার্কিন সেনা জড়িত নয়। এ ছাড়া তিনি এই বিক্রয় থেকে আর্থিক লাভের দিকটিও বিবেচনায় রেখেছেন। একটি প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের দাম প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, এবং ট্রাম্প বলছেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের লাভের অংশ।
“আমি বাণিজ্য অনেক কিছুতেই ব্যবহার করি,” ট্রাম্প বলেন। “কিন্তু যুদ্ধ থামাতে এটি দারুণ কাজ করে।”
ইউক্রেনের অনুরোধ ও ইউরোপের আগ্রহ
ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি গত মাসে নেদারল্যান্ডসে ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের কাছে অস্ত্রের তালিকা পেশ করেন। ইউক্রেন বলছে, রাশিয়ার মিসাইল ও ড্রোন হামলা মোকাবেলায় অন্তত ১০টি প্যাট্রিয়ট সিস্টেম দরকার।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এবং রুটে-র সঙ্গে ট্রাম্প এই পরিকল্পনা নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেন। এরপর রুটে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
রুটে জানান, ইউরোপের একাধিক দেশ এই পরিকল্পনায় আগ্রহ দেখিয়েছে।
এই পদক্ষেপগুলি ইউক্রেনকে আরও সহায়তা দেওয়ার নতুন পথ খুলে দিয়েছে। একইসাথে এটি ট্রাম্পের অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে – যেখানে একসময় তিনি যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলতেন, এখন তিনি পুতিনকে শান্তিচুক্তিতে বাধ্য করতে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছেন।



