বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: বছরে ১,৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) সই করেছে, তার কারণে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার তিনশো সাতাশ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারাবে বাংলাদেশ।
ঢাকা ভিত্তিক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মঙ্গলবার (১০ মার্চ) এই তথ্য উপস্থাপন করেছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে চার হাজার পণ্যকে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে হবে বাংলাদেশকে। আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও দুই হাজার দুইশো দশ ধরনের পণ্যেও এই সুবিধা বাড়ানো হবে।
তিনি বলেন, চুক্তিটি মূলত একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিয়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিওর ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এর আইনি পরিণতি সম্পর্কে তিনি সতর্ক করেন যে, ডব্লিউটিওর আওতায় সদস্য অন্যান্য দেশও এখন বাংলাদেশের কাছে একই সুবিধা দাবি করতে পারবে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় রাজস্ব ক্ষতির কারণ হতে পারে।
চুক্তিতে কেবল রাজস্ব ক্ষতিই নয়, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধিরও আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি।
ড. ফাহমিদা খাতুন ব্যাখ্যা করেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বেসরকারি খাত স্বেচ্ছায় এই পথে না হাঁটলে তাদের উৎসাহিত করতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
তিনি বলেন, “এই চুক্তি — রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের যে বিষয়টি রয়েছে — সরকারকে সেটা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।”
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই চুক্তির পূর্ণ বিষয়বস্তু এখনও যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়। তিনি চুক্তিটি জনসমক্ষে সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত করার দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন হবে, কার কাছ থেকে পণ্য কেনা যাবে আর কার কাছ থেকে যাবে না — এই বিষয়গুলো দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তবে মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি নির্দেশনার পর পুনরায় আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে একশো ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিপিডির গবেষকরা।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ডিজেল ও অকটেনসহ অন্যান্য জ্বালানির মজুত মাত্র কয়েক সপ্তাহের। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের কোনো স্থায়ী কৌশলগত জ্বালানি মজুত নেই।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আতঙ্কে কেনাকাটার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই প্রবণতা বাড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার স্পট বায়িং করছে এবং ভারতের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির চুক্তি পুনরায় চালু করছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি কিনতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেজন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ঋণ নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। কারণ, রিজার্ভের উপর নির্ভর করে দেশের খাদ্য ও সার আমদানির মতো অপরিহার্য বিষয়গুলো।
চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি।
জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১২.৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ, বছর শেষে লক্ষ্যপূরণ করতে হলে বাকি সময়ে ৫৯.৪ শতাংশ হারে আদায় করতে হবে, যা কার্যত অসম্ভব, এ পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা, ঘাটতি পূরণে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হয়েছে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকার ঋণ, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, রপ্তানি আয় কমেছে ৩.২ শতাংশ; আমদানি বেড়েছে ৩.৯ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি আটকে রয়েছে আট শতাংশের উপরে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটটি নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। তিনি সতর্ক করেন যে, অতীতের মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ থেকে সরে এসে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখন এই অনুপাত মাত্র ৬.৮ শতাংশ। এই ব্যবধান ঘোচাতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারকে এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি।



