ঈদুল ফিতর এবং তার পরেও আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখবে ইসরায়েল

ঈদুল ফিতর এবং তার পরেও আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখবে ইসরায়েল

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আসন্ন ঈদুল ফিতর এবং তার পরেও আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল।

মসজিদটির বিষয়াদির সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি মসজিদ পরিচালনাকারী সংস্থা ইসলামিক ওয়াকফকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের মধ্যে ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির’ কথা উল্লেখ করে চলতি মাসের শুরুতে ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

রমজান মাসে এই নজিরবিহীন বন্ধের ঘটনাকে ফিলিস্তিনিরা নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, নিরাপত্তা উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে আল-আকসার ওপর আরও বিধিনিষেধ চাপানো ও নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করার ইসরায়েলের সর্বশেষ প্রচেষ্টা এটি।

১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম রমজানে আল-আকসায় জুমার নামাজ আদায় করতে পারলেন না ফিলিস্তিনিরা। জুমার নামাজ ও রমজানের রাতের নামাজে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রয়েছে। পুরনো শহরে (ওল্ড সিটি) ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতির মধ্যে মসজিদের কাছে যেতে পারছেন না ফিলিস্তিনিরা।

গত সপ্তাহে আটটি মুসলিমপ্রধান দেশ এই ‘অযৌক্তিক’ বন্ধের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, পবিত্র এই স্থানের ওপর ইসরায়েলের ‘কোনো সার্বভৌমত্ব নেই’ এবং অবিলম্বে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করতে হবে। তবে সে আহ্বানে কর্ণপাত না করে বন্ধ অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল।

মসজিদ বন্ধের পর থেকে প্রতিটি শিফটে সর্বোচ্চ ২৫ জন ওয়াকফ কর্মীকে বিশাল মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। একটি সূত্র জানায়, পাণ্ডুলিপি বিভাগের একজন অতিরিক্ত কর্মীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। পুলিশ ওয়াকফকে জানিয়েছে, অতিরিক্ত কোনো কর্মীকে ঢুকতে দিলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদেরও মসজিদে প্রতিদিনের অনুপ্রবেশ পুনরায় শুরু করতে দেওয়া হবে।

ওয়াকফ কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, আল-আকসার নামাজ হলগুলোতে—কুব্বাতুস সাখরার ভেতরেও—ইসরায়েলি বাহিনী ক্যামেরা স্থাপন করেছে, যার মাধ্যমে স্থানটির ওপর ক্রমাগত নজরদারি চলছে।

মসজিদ বন্ধের পাশাপাশি ওল্ড সিটিতেও প্রায় সম্পূর্ণ অবরোধ জারি করা হয়েছে, যেখানে আল-আকসা ও ফিলিস্তিনিদের পরিচালিত শতাধিক প্রাণচঞ্চল বাজার রয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কেবল ওল্ড সিটির বাসিন্দাদেরই ভেতরে প্রবেশের অনুমতি রয়েছে, ফলে এলাকাটি জনশূন্য হয়ে পড়েছে। অথচ প্রাচীন দেয়ালের ঠিক বাইরে মাত্র কয়েক মিটার দূরে জীবন চলছে স্বাভাবিকভাবেই।

ইসলামি বর্ষপঞ্জির সবচেয়ে পবিত্র রজনী লাইলাতুল কদরে শত শত পুলিশ মোতায়েন করে মসজিদে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। ফলে উপাসকদের সহিংসতার হুমকির মধ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হয়।

আল-আকসা মসজিদে অধ্যাপনা করেন এমন একজন শিক্ষক ও ইসলামিক ওয়াকফ কাউন্সিলের সদস্য অধ্যাপক মুস্তাফা আবু সোয়ে বলেন, ‘এভাবে ওল্ড সিটি বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। ওল্ড সিটির ভেতরে যা হচ্ছে আর বাইরে যা হচ্ছে তার মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য আছে।’ তিনি আরও বলেন, মানুষের নিরাপত্তাই যদি উদ্বেগের কারণ হয়, তাহলে উপাসকেরা আল-আকসার নিচের নামাজ হলগুলোতে আশ্রয় নিতে পারেন, যেখানে হাজার হাজার মানুষের জায়গা হয়।

ওয়াকফের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক আউনি বাজবাজ এর আগে মিডল ইস্ট আইকে বলেছিলেন, এই বন্ধ দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ‘সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে যা উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা ক্রমে স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী রূপ নিতে পারে—বিশেষত যদি মানুষ এই বিধিনিষেধে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন বা মসজিদে প্রবেশের ধরন বদলে যায়,’ তিনি বলেন।

আল-আকসা মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হয়ে আসছে, যা এটিকে একচেটিয়া ইসলামিক স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করে। এই ব্যবস্থায় মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রশাসন ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব জর্ডান-নিযুক্ত ধর্মীয় সংস্থা ইসলামিক ওয়াকফের হাতে।

তবে ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে ফিলিস্তিনিরা বলছেন, মুসলমানদের প্রবেশাধিকারে ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধ এবং ইহুদি উপস্থিতি ও ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেম ও ওল্ড সিটির ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ বেআইনি। আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতি বলে, কোনো দখলদার শক্তির অধিকৃত ভূখণ্ডে সার্বভৌমত্ব নেই এবং সেখানে স্থায়ী পরিবর্তন আনা যায় না।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই