গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে রমনা পার্ক শুধু মানুষ আর মানুষ। গ্রামগঞ্জে মেলা, ঘরে ঘরে উৎসব। এমনই বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের চিরায়িত রূপ৷। এবার ভিন্ন আবহে ‘গৃহবন্দি’ এক পহেলা বৈশাখ উৎযাপন করল জাতি।
ছিল না রাস্তায় মানুষের ভীড়। উৎসবের চেয়ে যেন নিরন্ন মানুষের মুখে আহার তুলে দেওয়া, ভয়-আতঙ্ক দূর করে স্বাভাবিক পৃথিবী ফিরে আসার আকুতি ছিল মানুষের মধ্যে।
স্বাধীনতার পর থেকে রমনা বটমূলে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গান গেয়ে নতুন বছর বরণের আয়োজন করে আসছে ছায়ানট। বাঙালির প্রাণের এই উৎসব আরো রাঙিয়ে দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। এছাড়াও সারাদেশেই হয় বিভিন্ন আয়োজন। এবার সেসবের কিছুই নেই৷ ঢাকা এখন সুনসান নীরব। করোনা ভাইরাসের থাবায় প্রাণহীন পহেলা বৈশাখ।
৪৯ বছরে ছেদ পড়ল ছায়ানটের অনুষ্ঠান
১৯৭১ সালের পর থেকে কখনই বন্ধ হয়নি ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। শুধুমাত্র ২০০১ সালে তীব্র বাধা এসেছিল অনুষ্ঠান না করতে৷ শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান হয়েছে। ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ড. সারওয়ার আলী বলেন, এই পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠানের কথা তো আমরা ভাবতেই পারি না। তবুও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব নিয়ম কানুন মেনে খুবই ছোট্ট পরিসরে বিটিভিতে একটা অনুষ্ঠান হয়েছে। কারো কোন বিরোধীতা নেই, তবুও হলো না ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। কেন হল না, কেন আমরা করতে পারিনি- সেটা সবাই জানেন। আসলে এই সময়টা আমাদের নিরন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। এখন উৎসব নয়, মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই প্রধান চ্যালেঞ্জ। সবার একটাই চাওয়া, করোনা যুদ্ধে যেন আমরা জয়ী হতে পারি।
মঙ্গল শোভাযাত্রার টাকায় পিপিই
প্রতি বছরই পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভযাত্রার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ। ‘‘এবার মঙ্গল বার্তা নিয়ে আসা মঙ্গল শোভাযাত্রাও বাতিল করা হয়েছে জাতির মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই,’’ বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার আহমেদ। তিনি বলেন, ‘‘গত মাসে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রথম বৈঠকেই আমি বলেছি, এবার আমরা আয়োজন করব না। সেটা সম্ভবও না। এটা এক বিরাট কর্মযজ্ঞ৷ শত শত শিক্ষার্থী এই আয়োজনে যুক্ত হতেন৷ এবার তেমনটা কিছুই হয়নি।’’
অধ্যাপক নিসার বলেন, ‘‘এবার আমরা সকল শিক্ষক বড় অংকের একটা তহবিল তৈরী করে সেটা দিয়ে পিপিই তৈরী করেছি। মঙ্গল শোভাযাত্রায় আমরা এই টাকা খরচ করতাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বসে এবং গার্মেন্টস ব্যবসায়ী বন্ধুদের দিয়ে আমরা তিন হাজার ৩০০ পিস উন্নত মানের পিপিই তৈরী করেছি৷ সেটা বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে চিকিৎসকদের দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা যে যুদ্ধে নেমেছি, এই যুদ্ধের কৌশলটি হচ্ছে আমাদের ঘরে অবস্থান করা। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার এটাই একমাত্র কৌশল। আমরা কিন্তু ভয়ে ঘরে অবস্থান করছি না। এই যুদ্ধে জয়ী হতে গেলে আমাদের এটাই মানতে হবে৷ ৩০ বছর পর ৩১ বছরে এসে ছেদ পড়ল মঙ্গল শোভাযাত্রার।’’
অর্থনীতির বিরাট ক্ষতি, ক্ষতিগ্রস্থ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা
পহেলা বৈশাখ ঘিরে বিরাট এক কর্মযজ্ঞ শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মেলার জন্য অনেক কিছু তৈরী করেন। এবার সবকিছুই বন্ধ হয়ে গেছে৷ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই এমন মনে করেন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিচার্স ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ কেন্দ্রিক যে অর্থনীতির ক্ষতিটা হয়ে গেল সেটা কোনভাবেই পূরণ করা যাবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এটা তো বিশেষ উৎসব ঘিরে। এই উৎসব তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। শুধুমাত্র এই একটি উৎসব যেখানে শুধু দেশীয় পণ্যই বিক্রি হয়। মানুষ মেলায় যায়, দেশীয় পণ্য কেনাকাটা করে। গ্রামীণ নারীরা অনেক কিছু তৈরী করেন। অনেকেই এই মেলাকে ঘিরে সারা বছরের একটি পরিকল্পনা সাজান। তাদের ক্ষতি তো পুষিয়ে দেওয়া যাবে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, করোনার কারণে অর্থনীতির যে ক্ষতিটা হচ্ছে তার মধ্যে পহেলা বৈশাখের ক্ষতি বড় একটা মাত্রা যোগ করবে। আমাদের দেশে ৬ কোটি ১০ লাখ শ্রমিক আছেন। এর মধ্যে এক কোটি শ্রমিক দিন এনে দিন খায়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মসংস্থান যারা করেন তাদের সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ৷ তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ এই ধরনের কর্মকাণ্ডে কুটিরশিল্পে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘‘আমরা সরকারকে বলেছি, একটি পরিবারে চারজন আছেন এমন একটি পরিবারকে মাসে আট হাজার টাকা হিসেবে দুই মাসের ১৬ হাজার টাকা দিতে। তাতে সরকারের ২৭ হাজার কোটি টাকা লাগবে, যা জিডিপির এক শতাংশ। এভাবেই এই ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের সহায়তা করা যেতে পারে।
ঘরে পহেলা বৈশাখের আয়োজন
সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘‘বাঙালির সার্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষ। প্রতিটি বাঙালি আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে উদযাপন করে থাকেন এই উৎসব। এ বছর বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের মহামারির কারণে পহেলা বৈশাখের বাইরের সব অনুষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সবাই ঘরে ঘরে এই উৎসব পালন করুন। আঁধার কেটে নিশ্চয়ই আলো ফুটে উঠবে।’’
ঘর থেকে কেউ বের হয়নি সত্য। কিন্তু ঘরের মধ্যে কি সত্যি পহেলা বৈশাখের আয়োজন হয়েছে। রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা ইমরুল হাসান বলেন, এভাবে কি বৈশাখ হয়৷ অন্য আর ১০টা দিনের মতোই বন্দি দিন কেটেছে। তবে খাওয়াতে কিছুটা ভিন্নতা ছিল। শেওড়াপাড়ার আরেক বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, ‘‘আজ তো ছিল আমরা দোকানের হালখাতা৷ নতুন খাতা খোলা হলো না। অনেকেই বাকী রাখেন, হালখাতায় শোধ করেন। এখন কিভাবে আমার পাওনা টাকা উঠবে, সেটা নিয়ে সেটা নিয়ে দুঃচিন্তায় আছি। দোকান বন্ধ, কর্মচারীদের বেতন কিভাবে দেবো? সব মিলিয়ে কষ্টে আছি।’’