গাজীপুরে একদিকে বনায়ন, অন্যদিকে বন দখল!
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গণভবনে গত ১৬ জুলাই গাছের চারা রোপণ করে মুজিববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে সারা দেশে এক কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিবেশ, বন এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় বর্তমান সরকারের এটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। কিন্তু এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চললেও গাজীপুরে একদিকে বনায়ন অন্যদিকে বন দখলের হিড়িক পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভাওয়াল বন হিসেবে খ্যাত ঢাকার নিকটবর্তী গাজীপুরে কাগজে-কলমে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৫২ হাজার একরের বেশি। তবে বাস্তবে গত দুই দশকে জেলার মোট বনাঞ্চলের অর্ধেকের বেশি বেহাত হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। বিশেষ করে, বিগত প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) শফিউল আলম চৌধুরীর আমলে গাজীপুরে রেকর্ড সংখ্যক বনভূমি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দখলে চলে যায়। অথচ গাজীপুরে বনভূমি রক্ষায় ঢাকা বন বিভাগ এবং ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
যদিও গাজীপুরে বন দখলের ঘটনায় ঢিলেঢালা তদন্ত এবং তদন্তের নামে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের কারণে বেহাত বন উদ্ধার ধোঁয়াশায়। এছাড়া অযোগ্য, বিতর্কিত এবং দুর্নীতিগ্রস্তদের ঘুরে ফিরে গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ বিটের দায়িত্ব দেওয়ায় জেলায় একের পর এক বন দখলের ঘটনা ঘটছে। অথচ উচ্চ পর্যায়ের তদবিরে গাজীপুরে দুর্নীতিগ্রস্তদের পোস্টিং ঠেকানোর পরিবর্তে নিজের চেয়ার রক্ষায় ব্যস্ত বন অধিদফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। এতে মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়ের চরম অভাব দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধান বলছে, ঢাকা বন বিভাগের অধীন গাজীপুর রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ। রেঞ্জটির রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটের নয়াগাঁও মৌজায় ১০, ৩০, ৩৬১, ৩৭৪ ও ৩৮২নং সিএস দাগে মোট বনভূমির পরিমাণ ১৮.২২ একর। অথচ লাগাতার দখলের ফলে ওই পাঁচটি সিএস দাগের বনভূমি বেহাত হওয়ার পথে। এছাড়া রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটের ফাউগাইন মৌজায় ১০৪, ৩৩০, ৩৮২, ৪৪৩, ৪৭৬, ৪৮৪, ৪৮৫, ৫১৫, ৮২১, ৮৪৮ এবং ৮৬০নং সিএস দাগে মোট বনভূমির পরিমাণ ১৫.৯৬ একর। তবে লাগাতার দখলকা-ে ওই মোট বনভূমির অর্ধেকের বেশি বন বিভাগের হাতছাড়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অন্যদিকে বসে নেই রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটের ফাউগাইন মৌজার বনখেকোরা। ওই মৌজার ৪২১ ও ৫১৩ সিএস দাগের ৯.০৯ একর বনভূমি লাগাতার দখলের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া আটলোড়া মৌজার ১৪১, ১৫৪, ২১৬, ২১৮, ২১৯, ২২২, ২৪৪, ২৫০, ২৬০, ২৬৯, ৩৪০, ৪৫৪ ও ৫২১ সিএস দাগে মোট বনভূমির পরিমাণ ৩৯.১১ একর হলেও বাস্তবে মোট বনভূমি অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
অনুসন্ধান আরও বলছে, ঢাকা বন বিভাগের রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটের ফাউগাইন এলাকায় বর্তমান বিট কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী শেখের আমলে বনে বাড়ি নির্মাণ করেছেন হানি নামে এক ব্যক্তি। নিশ্চিন্তপুর মৌজায় ফাউগাইন দরগার অদূরে নতুন ঢেউটিন দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন শামসুল। ওই বাড়ির পাশে কুমুর উদ্দিন নামে আর এক ব্যক্তি বনে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটে বন দখল করেছে ফাউগাইন ইকো রিসোর্ট। ওই রিসোর্টটির দক্ষিণে শাহাজ উদ্দিন ব্যাপারীর ছেলে আমজাদ হোসেন বনে টিনসেড বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ধলাদিয়া এলাকায় ধলাদিয়া কলেজের দক্ষিণ পূর্ব দিকে সীমানা নির্ধারণ ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ চালাচ্ছেন স্থানীয় দুলাল সিকদার নামে এক ব্যক্তি। এছাড়া নিশ্চিন্তপুর মৌজার লাগোয়া নয়াগাঁও মৌজার ৩৮৮নং সিএস দাগে প্রভাবশালী এক ব্যক্তি বন দখল করে বিভিন্ন প্রজাতির ফল বাগান গড়ে তুলেছেন। অথচ বেহাত ওই বনভূমি উদ্ধার করে সুফল প্রকল্পের আওতায় নেয়নি সংশ্লিষ্ট বিট অফিস।
কাবিলাতলী এলাকার স্থানীয় অধিবাসী এবং বাংলাদেশ কৃষকলীগের সহ-সভাপতি আকবর আলী চৌধুরী বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে বন দখল করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করছে শিল্প প্রতিষ্ঠান। বনে অগণিত ঘরবাড়ি নির্মিত হচ্ছে। সম্প্রতি কয়েকটি বন দখলের ঘটনা তিনি রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদকে জানিয়েছিলেন। তবে রেঞ্জ কর্মকর্তা দৃশ্যত ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। অথচ রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিট কর্মকর্তা ঘুষের টাকা পেয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছেন।
বন বেহাত কান্ডে নীরব ভূমিকা প্রসঙ্গে রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিট কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী শেখ জানান, বনে এসব ঘরবাড়ি কবে নির্মিত হয়েছে তিনি সেটা জানেন না। হয়ত তার আগের কর্মকর্তার আমলে এসব ঘরবাড়ি নির্মিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বনে এসব ঘরবাড়ি আপনার আমলেই হয়েছে এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আরও জানান, সুফল প্রকল্প এবং ব্যক্তিগত কাজে তিনি ব্যস্ত ছিলেন। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।



