দেশে প্রথম উচ্চ খরা-সহনশীল সয়াবিনের জাত উদ্ভাবন

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশে প্রথমবারের মতো উচ্চ খরা-সহনশীল সয়াবিনের একটি নতুন ইনব্রিড জাত উদ্ভাবন করল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি)। ‘জিএইউ সয়াবিন–৬’ নামে এই জাতটি উদ্ভাবিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এম. এ. মান্নানের নেতৃত্বে।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের সেকশন অফিসার মো. রনি ইসলাম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, এই নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৯৪টি। যা দেশের কৃষিক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিল।
জনসংযোগ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫০টি জার্মপ্লাজম নিয়ে তিন বছর ধরে গবেষণা চালানো হয়। সেই গবেষণায় ‘জি০০০৫৬’ জার্মপ্লাজমটি খরা-সহনশীল হিসেবে নির্বাচিত হয়। পরে ‘সলিডারিডেট নেটওয়ার্ক এশিয়া’র সহায়তায় নোয়াখালি, লক্ষ্মীপুর ও ভোলায় পাঁচ বছর মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার পর জাতীয় বীজ বোর্ড গত বছরের ১১ নভেম্বর এই জাতটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।
গবেষকদের দাবি, শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ফিল্ড ক্যাপাসিটির মতো কঠিন খরা পরিস্থিতিতেও এই জাতটি টিকে থেকে উচ্চ ফলন দিতে সক্ষম। উপকূলীয় চরাঞ্চলে সয়াবিন চাষের যে সীমাবদ্ধতা ছিল, ‘জিএইউ সয়াবিন–৬’ তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতি গাছে ৮০ থেকে ১০০টি ফল ধরে এবং বড় দানার কারণে ১,০০০ বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম। সাধারণ জাতের তুলনায় এর ফলন বেশি—হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩.২ থেকে ৩.৮ টন পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে।
এ জাতটির আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, বীজে ট্রিপসিনের মাত্রা কম থাকায় পোলট্রি খাদ্যে প্রোটিন শোষণের হার বাড়ে। ফলে পোলট্রি শিল্পের জন্য এটি বিশেষ উপযোগী। পাশাপাশি, তুলনামূলক কম সময়ে—মাত্র তিন মাস থেকে তিন মাস ১০ দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। ফলে স্বল্প সময়ে বেশি উৎপাদন করে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবেন।
পুষ্টিগুণের দিক থেকেও সয়াবিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফসল। এতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ উচ্চমানের প্রোটিন এবং ১৮ থেকে ২০ শতাংশ তেল রয়েছে। অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ এই ফসল অপুষ্টি দূরীকরণ, হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উদ্ভাবক অধ্যাপক ড. এম. এ. মান্নান বলেন, “‘জিএইউ সয়াবিন–৬’ আমাদের দীর্ঘদিনের গবেষণা, মাঠের রোদ-বৃষ্টি আর কৃষকের স্বপ্নের যৌথ ফসল। উপকূলীয় চরাঞ্চলের লবণাক্ততা, অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার বাস্তবতায় এই জাত কার্যকর সমাধান দিতে পারে। এত দিন খরা-প্রবণ জমিতে সয়াবিন চাষ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এই জাত সেই অনিশ্চয়তা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “‘জিএইউ সয়াবিন–৬’ বাংলাদেশের কৃষিতে এক যুগান্তকারী সংযোজন। খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা এবং কৃষকের জীবনে স্থিতিশীলতা আনতে এই জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।” তিনি গবেষক দল এবং মাঠ ও ল্যাব পর্যায়ের বিজ্ঞানীদের ধন্যবাদ জানান।
জানা গিয়েছে, এর আগেও এই গবেষণা দল লবণ ও জলাবদ্ধতা-সহনশীল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আরও পাঁচটি উচ্চফলনশীল সয়াবিন জাত উদ্ভাবনে সাফল্য রয়েছে।



