গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও কারসাজি রোধে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে সরকার। চলতি মাসের ৩ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় মোট ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে অবৈধভাবে মজুত করা ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৫৩টি মামলা দায়ের এবং ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত তেলের মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৬৫ লিটার ডিজেল, ২২ হাজার ৫৩৯ লিটার অকটেন এবং ৪৬ হাজার ১৪৬ লিটার পেট্রল রয়েছে। অবৈধ মজুতদারদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত মোট ৭৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
তেল সংকটের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “বিদেশ থেকে নিয়মিত তেলের জাহাজ আসছে। মার্চ শেষেও দেশে ১ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিজেল উদ্বৃত্ত আছে। এছাড়া ৫৪ হাজার ৬০০ টন ডিজেল নিয়ে আজ ৩০ মার্চ ও আগামী ৩ এপ্রিল আরও দুটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আসছে সাত হাজার টন ডিজেল।”
তিনি আরও জানান, চলতি মাসেই চীন, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আরও প্রায় দেড় লাখ টন ডিজেল দেশে যুক্ত হবে। ফলে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সংকটের কোনো কারণ নেই।
কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে থাকা তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজেল সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো জেলা থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে অভিযোগ আসেনি। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে সরবরাহ করা তেলের মাত্র ৬ শতাংশ অকটেন এবং ৬৩ শতাংশ ডিজেল। বর্তমানে পাম্পগুলোতে যে ভিড় দেখা যাচ্ছে, তা মূলত অকটেনের জন্য, ডিজেলের জন্য নয়।
জ্বালানি তেলের দামের বিষয়ে মুখপাত্র জানান, প্রতি মাসেই দাম সমন্বয় করা হয়। আগামী মাসের জন্য মূল্যবৃদ্ধির একটি প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে এসেছে। লিটারপ্রতি কত টাকা বাড়ালে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ কেমন হবে—এমন কয়েকটি চিত্র প্রস্তাবে দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য শিথিল হওয়ায় আগামী দুই মাসে দেশটি থেকে ছয় লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এছাড়া ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও অতিরিক্ত তেল আমদানির বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশি তেলবাহী জাহাজ যেন নিরাপদে হরমোজ প্রণালী ব্যবহার করতে পারে, সে বিষয়ে ইরানের সাথে আলোচনা চলছে এবং দ্রুতই ইতিবাচক সিদ্ধান্তের আশা করছে জ্বালানি বিভাগ।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন সংকট তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপালসহ প্রতিবেশী দেশগুলো তেলের দাম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে মুখপাত্র বলেন, অবৈধ মজুতদারি ও আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি কেনার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও সরবরাহ ব্যাহত হয়নি। বিশেষ করে ঈদের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ভিজিল্যান্স দল কাজ করছে। প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে।