গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
নিজ নিজ সংসদীয় আসনের রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সংসদ সদস্যপ্রতি ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দিতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রতিবছর ১০ কোটি টাকা করে পাঁচ বছরে এই অর্থ পাবেন ২৭৯ জন সংসদ সদস্য। তবে অতীতে এ ধরনের প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের নজির থাকায় নতুন উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন (বিভাগওয়ারি)’ নামের প্রকল্পটি তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে এলজিইডি। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। গত ২৩ মে সচিবালয়ে প্রকল্প যাচাই কমিটির একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এলজিইডির পরিকল্পনা শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সালেহ মোহাম্মদ হানিফ সংবাদ মাধ্যমকে জানান, প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। আগে যেসব সড়কের কাজ হয়েছে, নতুন করে সেসব সড়কে কাজ করা হবে না।
আট বিভাগে আট প্রকল্প
আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে ভিন্ন পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চাইছে বর্তমান বিএনপি সরকার। একটি প্রকল্পের বদলে আটটি বিভাগের জন্য আলাদা আটটি প্রকল্প নেওয়া হবে এবং প্রতিটির জন্য আলাদা প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, একটি প্রকল্পে সারা দেশের ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দও সম্ভব হয় না। একজন পিডির পক্ষে সারা দেশে কাজ তদারকি করা কঠিন—এসব বিবেচনায় বিভাগওয়ারি প্রকল্প নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা বিভাগের ৫৫টি, চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৫টি, রাজশাহী বিভাগের ৩৮টি, খুলনা বিভাগের ৩৪টি, রংপুর বিভাগের ৩৩টি, ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি, বরিশাল বিভাগের ২১টি এবং সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনের জন্য আলাদা আলাদা প্রকল্প নেওয়া হবে।
বরাদ্দ পাবেন ২৭৯ জন
সংসদের সব সদস্য এই বরাদ্দ পাবেন না। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে থাকা ১৫টি আসন, চট্টগ্রামের তিনটি, রাজশাহীর একটি ও খুলনার দুটি—মোট ২১টি আসনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হচ্ছে না। সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন সদস্যও এই বরাদ্দের বাইরে থাকবেন। সিটি করপোরেশন এলাকার আসনগুলো বাদ পড়ছে কারণ সেখানে নগর কর্তৃপক্ষ কাজ করে।
সূত্র জানিয়েছে, ২৭৯ জন সংসদ সদস্যের আসনের জন্য ৫০ কোটি টাকা করে পাঁচ বছরে মোট ব্যয় হবে ১৩ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। আরও এক হাজার কোটি টাকা খরচ হবে জনবল নিয়োগ, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খাতে।
কেন দ্বিগুণ বরাদ্দ
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ প্রস্তাবে আসনপ্রতি বরাদ্দ ছিল ২৫ কোটি টাকা, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটিতে।
এলজিইডির পরিকল্পনা শাখার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদ মাধ্যমকে জানান, নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে আগামী পাঁচ বছরে—সে সময়ে দাম আরও বাড়বে। এসব বিবেচনায় আসনপ্রতি ৫০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
এ ধরনের বরাদ্দ শুরু হয়েছিল ২০০৫-০৬ অর্থবছরে, যখন আসনপ্রতি মাত্র দুই কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছিল। এরপর নবম সংসদে ১৫ কোটি, দশম ও একাদশ সংসদে ২০ কোটি করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১০ সালে ৪ হাজার ৮৯২ কোটি, ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৭৬ কোটি এবং ২০২০ সালে ৬ হাজার ৫২৬ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।
অতীতের অভিজ্ঞতা উদ্বেগজনক
দুর্নীতি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২০ সালে নেওয়া প্রকল্পের ৬২৮টি কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বহুমাত্রিক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৩ শতাংশ স্কিমে কাজের মান সন্তোষজনক ছিল না। মোট ব্যয়ের ৮ থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ হারে কমিশন বাণিজ্য হয়েছে এবং এর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এলজিইডির কর্মীরা জড়িত ছিলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা ক্ষমতাবলে সরাসরি কাজ পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও দলের কর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। এ ছাড়া এক থেকে দুই শতাংশ হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী আসনে বরাদ্দ নিয়ে করা গবেষণায় আমরা দলীয়করণ, টাকার অপচয় ও দুর্নীতি পেয়েছি। এবার যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা থাকে, তাহলে আগের মতো অভিযোগ উঠতে পারে।’
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে নেওয়া সর্বশেষ ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন-৩’ প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো ৮২৩টি প্যাকেজের কাজ চলমান এবং ৭৭টি কর্মসূচিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
সাংবিধানিক প্রশ্ন ও বিতর্ক
এ ধরনের প্রকল্পকে ঘিরে দুটি মৌলিক প্রশ্ন বহু বছর ধরে উঠে আসছে। প্রথমত, সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের কাজ আইন প্রণয়ন এবং ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। দ্বিতীয়ত, সংসদ সদস্যদের পছন্দে নেওয়া প্রকল্পে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি রোধ করার কার্যকর প্রক্রিয়া কী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, তাত্ত্বিকভাবে সংসদ সদস্যদের কাজ আইন প্রণয়ন। তবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দেখা যায়, রাজনীতিবিদেরা নিজ এলাকার উন্নয়নকাজও করেন এবং মানুষও তা প্রত্যাশা করেন। তবে এটি কাঙ্ক্ষিত কি না, সে বিতর্ক থেকেই যায়।
এ দিকে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিগত সরকারের সময়ে তাঁর আসনে রাস্তাঘাটের তেমন উন্নয়ন হয়নি। তাই জরুরি ভিত্তিতে এসব রাস্তাঘাট উন্নয়ন করা দরকার।
টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের আরও ২৩টি দেশে সংসদীয় আসনের অবকাঠামো উন্নয়নে সংসদ সদস্যপ্রতি থোক বরাদ্দের নজির রয়েছে। ভারত, ভুটান, কেনিয়া, ঘানা, উগান্ডা, জ্যামাইকা, পাপুয়া নিউগিনি ও সলোমন আইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আইনি কাঠামো, পরিচালনা ও তদারকিব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়।