ছাত্র রাজনীতি বন্ধে নেতিবাচক প্রভাবের শংকা

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ছাত্র রাজনীতি নয়, দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বন্ধের কথা বলছেন ছাত্র নেতারা। আর ডাকসুর সাবেক ভিপি মান্না ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন।

বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের নোটিশ জারি করা হয়েছে শনিবার। এর আগে আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে শুক্রবার ছাত্রদের সাথে বৈঠকে ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন৷ এরই মধ্যে বুয়েট ছাত্রলীগের সভপতির আবাসিক হলের কক্ষসহ তিনটি কক্ষ সিলগালা করা হয়েছে।

এদিকে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা ১৪ অক্টোবর যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে আগামী দুইদিনের জন্য আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ছাত্র সংগঠন তাদের বুয়েট কমিটি ভেঙে দেয়নি। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে তারা কমিটি ভাঙবে না। কিন্তু প্রকাশ্য তৎপরতা বন্ধ রাখবে। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেহেদি হাসান নোবেল বলেন, ‘‘বুয়েট প্রশাসন যেহেতু ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছেন তাই হয়তো ছাত্র ইউনিয়ন সেখানে প্রকাশ্যে বা আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করবে না। কিন্তু ছাত্র ইউনিয়ন সেখানে থাকবে। কমিটি থাকবে, তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করবে।”

তিনি ছাত্র রাজনীতি বন্ধের বিপক্ষে মত দিয়ে বলেন, ‘‘যেটাকে ছাত্র রাজনীতি বলা হচ্ছে ওটা আদৌ ছাত্র রাজনীতি নয়। বুয়েটে যেটা ছিলো তা হলো ছাত্রলীগ ও বুয়েট প্রশাসনের মিলিত স্বৈরতন্ত্র। সেই কারণে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করলে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর এর ফলে বুয়েটে প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের উত্থান ঘটবে এবং বুয়েট প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্র আরো বাড়বে।”

তিনি মনে করেন, ‘‘ছাত্র সংসদ কার্যকর করে শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে সুস্থ রাজনীতির জয় হবে। তা না করে রাজনীতি বন্ধ করলে ক্ষমতাসীনদের প্রভাব কমবেনা। ছাত্র রাজনীতি না থাকলেও তাদের ক্ষমতা থাকবে।”

ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং সাবেক ছাত্রনেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘‘ছাত্র রাজনীতি না থাকলে তারা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে যাবে। দেশ সম্পর্কে, রাষ্ট্র সম্পর্কে, সমাজ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা থাকবে না। তাদের কোনো দায়বদ্ধতা তৈরি হবে না। আর ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে জামায়াত শিবিরের কাজের কোনো অসুবিধা হবেনা। তারা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবে।”

তিনি বলেন, ‘‘এর আগেও ছাত্র মারা গেছে৷ তখন ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধের দাবি ওঠেনি। এখন কেন উঠছে? এর কারণ হলো এই সময়ে স্পষ্ট হয়েছে যে ক্ষমতাসীনরা তাকে মেরে ফেলেছে। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন একটা খুনি তৈরির কারখানা। আপনি তাদের ব্যান করে দেন৷ তাও যদি না পারেন এই ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তাদের ব্যান করেন। টর্চার রুম, গণ রুম বন্ধ করে দেন৷ আপনি সেটা করবেন না। এখন ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ তাই ক্ষতাসীন ছাত্র সংগঠন বলতে আমি তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকেই বুঝিয়েছি। তারা হত্যা করছে, নির্যাতন করছে। তাদের অত্যাচার নির্যাতন এমন পর্যায়ে গেছে যে সেগুলো বন্ধ করা প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, ‘‘বুয়েটে যদি ছাত্র সংগঠন থাকত তাহলে আবরার মারা যেত না। প্রতিরোধ হতো৷ আবার যে প্রতিবাদ হয়েছে তাও ছাত্র রাজনীতির কারণে। ওদের যদি জার্সি না থাকতো তাহলে ওদের চিহ্নিত করা যেত না। ১৯ জন কেন একজনও গ্রেপ্তার হত না। কিন্তু সরকার তাদের গ্রেপ্তারে বাধ্য হয়েছে।”

ডাকসুর বর্তমন ভিপি নুরুল হক নুর মনে করেন, ‘‘বুয়েটে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছে। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়নি। ছাত্ররা ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নির্যাতন, নিপীড়ন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির শিকার হয়েছে। তাই বুয়েট কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট বলেছে সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছে৷ ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়নি।”

আর ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘‘আমি ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পক্ষে নই। বুয়েট প্রশাসন কি নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে ছাত্র রাজনীতি না থাকলে সব সমস্যার সামাধান হয়ে যাবে? ছাত্র রাজনীতি না থাকলে বরং স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। ছাত্রদের পক্ষে কথা বলার কেউ থাকবে না। ছাত্র রাজনীতির সমস্যা থাকলে তা সমাধান করতে হবে। কিন্তু ছাত্র রাজনীতি বন্ধ কোনো সমাধান নয়।”

বুয়েটে ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আমরা বুয়েট প্রশাসনের কাছে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানবো। তারপরও যেহেতু বুয়েট প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমরা বৈঠক করে পরবর্তী করণীয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব।”

অন্যদিকে মাহমুদুর রাহমান মান্নার ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের দাবীর নিন্দা জানান তিনি। বলেন,‘‘মাহমুদুর রহমান হয়তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ প্রগতিশীল আন্দোলনে ছাত্রলীগের অবদান ভুলে গেছেন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মাকসুদ কামাল মনে করেন, লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি অবশ্যই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন, তবে ছাত্র রাজনীতি নয়। তাঁর মতে, ‘‘এখন ছাত্র রাজনীতি যেদিকে গেছে তা চলতে পারে না। এটা পরিশীলিত হওয়া প্রয়োজন। ছাত্রদের মুক্তচিন্তা, তাদের মত প্রকাশ নিয়ে যে ছাত্র রাজনীতি তা বিশ্বের সব দেশেই আছে। আমাদের সেদিকে যেতে হবে।”

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button