বিধিনিষেধ ভেঙে কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ঘোষিত লকডাউন ছিল না, ছিল কিছু বিধিনিষেধ। সেনা ছিল, পুলিশ ছিল রাস্তায়, দুই একদিন ধরে আর কিছুই নেই দেশে। যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কারণে-অকারণে রাস্তায় বের হচ্ছেন। অলি-গলি দোকানেও ভিড়।

পুলিশের বা অন্য কারো চেকপোষ্টেরও এখন আর দেখা মিলছে না। ফলে বাঁধা দেওয়ারও কেউ নেই৷ কোথাও কোথাও যানজট ফিরে আসছে চেনা চেহারায়। ঢাকার প্রবেশ মুখগুলোও এখন উন্মুক্ত।

‘লকডাউন’ ভেঙে পড়ায় কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ? জানতে চাইলে রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘‘আমি বুঝতে পারছি না, আমরা কি ব্রাজিল বা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থার দিকে যাচ্ছি? এখন এই শৈথিল্য ভয়াবহ পরিনতির দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে না তো? আমরা বারবার বলছি, এখন শৈথিল্য দেখানো যাবে না। কিন্তু রাস্তা ঘাটে যে অবস্থা তাতে মনে হচ্ছে করোনা যুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা উৎসব করছি। কিছু মানুষ তো প্রয়োজনে বের হচ্ছেন। কিন্তু অপ্রয়োজনে বের হওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়। এদের নিবৃত্ত করতে হবে। এই মাস আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও বুঝতে হবে।’’

ঈদের আগেই দোকান খোলার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশে ৫ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি রয়েছে। এই ছুটির মেয়াদ আরো ১০ দিন বাড়ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে রংপুর বিভাগের আট জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মত বিনিময়ের সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমাদের সরকারি অফিস আদালত সব সীমিত আকারে আমরা চালু করে দিচ্ছি। যাতে মানুষের কষ্ট না হয়৷ সামনে ঈদ। ঈদের আগে কেনাকাটা বা যা যা দরকার সেগুলোও যেন মানুষ করতে পারে।’’ কিন্তু লকডাউন শিথিল হলেও মানুষ যেন সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, সে বিষয়ে সতর্ক করেন সরকারপ্রধান।

ঈদের আগে দোকানপাট খোলার যে ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তাতে কি মানুষ একটু বেশি করে রাস্তায় বের হবেন? আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও কি শিথিলতা দেখাবে? ডা. মুশতাক বলেন, ‘‘এখন যদি শিথিলতা দেখানো হয়, পরিণতি কি হবে সেটা ধারণা করা কঠিন। আমরা তো বলছি, এখন পর্যন্ত আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি। আর কিছুদিন এটা ধরে রাখতে পারলে সবাই একসঙ্গে বের হতে পারব। এখন আরো কঠোর করা উচিত।’’

এরপর সাধারণ ছুটি আরও ১১ দিন বাড়িয়ে আগামী ১৬ মে পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা দিয়ে আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

আদেশে বলা হয়েছে, ৭-১৪ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ ছুটির সঙ্গে ৬ মে’র বুদ্ধ পূর্ণিমার ছুটি এবং ১৫ ও ১৬ মে’র সাপ্তাহিক ছুটিও যুক্ত হবে।

অপরদিকে ঈদ-উল-ফিতরকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি শর্ত মেনে আগামী ৭ মে থেকে শপিংমল খুলছে বলে বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আদেশেও রমজান ও ঈদ-উল-ফিতরকে সামনে রেখে সীমিত পরিসরে ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রাখার স্বার্থে দোকানপাট খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়।

বেচাকেনার সময় ক্রেতা-বিক্রেতাদের পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করার জন্যও সেই আদেশে বলা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা আদেশে দেওয়া শর্তগুলো হলো-

১. বড় শপিংমলের প্রবেশমুখে হাত ধোঁয়ার ব্যবস্থা ও স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

২. শপিংমলে আসা যানবাহনকে অবশ্যই জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৩. দোকানপাট এবং শপিংমল বিকেল ৫টার মধ্যে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে সরকার প্রথম দফায় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব অফিস আদালত বন্ধ ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে সারা দেশে সব ধরনের যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারিসহ শপিং মলও বন্ধ রাখতে বলা হয়।

সেই ছুটির মেয়াদ ইতিমধ্যে ১৬ মে পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। এতদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। এখন তা দুই ঘণ্টা শিথিল করা হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, ‘জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে আসা যাবে না।’

লকডাউন বলে কিছুই নেই

সোমবার রাজধানীতে ঢোকার প্রবেশ মুখগুলোতে দেখা গেছে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, অবাধে প্রবেশ ও বের হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন পয়েন্টে ছিল যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বেশিরভাগ চেকপোস্টে ছিল না পুলিশের উপস্থিতি। এই সুযোগে প্রাইভেটকার, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলে অবাধে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডে দেখা যায়নি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা। গাবতলী ও আব্দুল্লাহপুরেও ছিল না পুলিশ। দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘসারি। ছিল ঢাকামুখী মানুষ ও যানবাহনের চাপ।

পুলিশ কি শিথিলতা দেখাচ্ছে?

চেকপোষ্টে কেন পুলিশ নেই? সোমবার পর্যন্ত ৯১৪ জন সদস্য আক্রান্ত ও ৫ জনের মৃত্যু হওয়ায় পুলিশ কি শিথিলতা দেখাচ্ছে? জবাবে পুলিশের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (এআইজি) সোহেল রানা বলেন, ‘‘পুলিশ কোন শিথিলতা দেখাচ্ছে না। বাহিনীর সদস্যদের মনোবলও চাঙা আছে। বিপুল সংখ্যক সদস্য আক্রান্ত হওয়ায় এখন নানা ধরনের কৌশল নিতে হচ্ছে। পৃথক শিফট করা হচ্ছে। যাতে একসঙ্গে সবাই আক্রান্ত না হন। আইজিপি এ ব্যাপারে নিয়মিত নির্দেশনা দিচ্ছেন। আমরা আক্রান্ত সদস্যদের ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখছি। তাদের মনোবল চাঙা রাখতে নিয়মিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।’’

বিপুল সংখ্যক সদস্য আক্রান্ত হওয়ায় পুলিশের মনোবলে কি চিড় ধরেছে? জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, ‘‘এত সদস্য আক্রান্ত হলে একটু সতর্ক তো হতেই হবে। তা না হলে পরে দায়িত্ব পালনের লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখন পুলিশকে নানা ধরনের কৌশল নিতে হবে। মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বও পালন করতে হবে, আবার সদস্যদেরও নিরাপদে রাখতে হবে। এখন উর্ধ্বতনদের দায়িত্বটা বেশি৷ কোন সদস্য যেন মানষিকভাবে ভেঙে না পড়েন সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।’’

করোনা আতঙ্কে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা

এদিকে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক কনস্টেবল করোনা আতঙ্কে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। সোমবার সকালে খিলগাঁও তিলপাপাড়ার বাসার পাঁচতলার ছাদ থেকে লাফ দেন তিনি। খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, ‘‘কনস্টেবল তোফাজ্জল হোসেন কয়েক দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। এরপর তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা তার পরীক্ষা করেন। কিন্তু পরীক্ষায় রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। এ নিয়ে তিনি মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন বলে তার স্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন। তোফাজ্জল ভাবছিলেন তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, হয়তো টেস্টে ধরা পড়েনি৷ গত কয়েকদিন ধরে এসব চিন্তায় তার ঘুম হচ্ছিল না।’’

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে