গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
চাঁদাবাজি, জমি দখল ও সহিংসতার অভিযোগ ওঠা নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া জোরদার করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদমর্যাদা না দেখেই বহিষ্কারসহ শাস্তি দেওয়া হবে। গুরুতর ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব অভিযুক্তদের তালিকা তৈরি করছে। তৃণমূল থেকে আসা অভিযোগ যাচাই করার পর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, চাঁদাবাজি, টোল আদায় ও জমি দখল নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার অনেকগুলোই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে কোনো নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলেই কেবল ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তার ভাষায়, “ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে কেউ দলের নাম ব্যবহার করতে পারবেন না।” চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, অপরাধমূলক কাজে দলের পরিচয় ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে “জিরো টলারেন্স” নীতি নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইতোমধ্যে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, প্রকৃত জাতীয়তাবাদী কর্মীরা চাঁদাবাজি বা দখলে জড়াতে পারেন না। যারা জড়াবেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি, দুই ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তবে নেতারা এও বলছেন, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। শাস্তির আগে প্রতিটি ঘটনা এবং অভিযুক্তের প্রকৃত ভূমিকা যাচাই করা হবে।
ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় সম্প্রতি হামলা, ভাঙচুর ও জমি দখলের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে এবং ইসিবি এলাকায় কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ ওঠা কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় কোনো রাজনৈতিক যোগসূত্র পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি জানান, চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলছে এবং তা আরও বাড়ানো হবে।
মন্ত্রী বলেন, অপরাধীদের তালিকা তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ করা পুলিশের রুটিন কাজ। “অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না,” বলেন তিনি। ওই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে বা স্থাপনায় ভাঙচুর ও মানুষের ওপর হামলা হলে সরকার উদ্বিগ্ন ও বিব্রত হয়। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশ দলের ভেতরে “শুদ্ধি অভিযান” চালানোর দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন আন্দোলনে থাকা কর্মীদের সঙ্গে সম্প্রতি ব্যক্তিস্বার্থে দলের নাম ব্যবহার করতে চাওয়াদের এক করে দেখা ঠিক হবে না। এসব নেতার মতে, দলের নামে অপরাধে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাঁরা “হাইব্রিড” বা “নতুন বিএনপি” পরিচয়ে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকার কথা বলছেন, যাতে দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাঁরা প্রভাব খাটাতে না পারেন। কমিটিতে দায়িত্ব দেওয়ার আগে কারও রাজনৈতিক পরিচয়, সংগঠনে ভূমিকা ও জনগণের সঙ্গে আচরণ বিবেচনার ওপরও জোর দিচ্ছেন তাঁরা।
দলীয় সূত্র বলছে, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় বহিষ্কার, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রামের চিলমারী, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, কুমিল্লা ও ঢাকার কয়েকটি এলাকায় এ ধরনের ব্যবস্থার উদাহরণ আছে।
নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নয়; উদ্দেশ্য দলীয় শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি রক্ষা করা। দলের অবস্থান, রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের আড়াল হিসেবে কাজ করবে না। সরকারও একই কথা বলছে যে আইনি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন