
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সারা জীবন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে তার অবদান অনন্য। কঠিন সময়েও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিতেন তিনি। দেশপ্রেমকে আজীবন লালন করেছেন। খালেদা জিয়া বলতেন, ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, কিন্তু প্রভু নেই, দেশই আমার আসল ঠিকানা।’ এ কারণেই তার শেষবিদায়ে মানুষের এত ভালোবাসা পেয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। তিনি ছিলেন পরমতসহিষ্ণু। জাতির এই কঠিন সময়ে যখন তার উপস্থিতি, পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখনই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু তার আদর্শ চির অম্লান। এ দেশের মানুষ অনন্তকাল তাকে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় স্মরণ করবেন। তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক সমাজের উদ্যোগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নাগরিক শোকসভায় দেশের বিশিষ্টজনরা এসব কথা বলেন। বেলা আড়াইটার পর কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। শোকসভায় যোগ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। এ সময় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেগম খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, মানুষ বেগম জিয়াকে অনন্তকাল স্মরণ করবে। কারণ, দেশের জন্য তার ত্যাগ ও নিষ্ঠা অপরিসীম। তিনি এ দেশের মানুষ, গাছ, লতাপাতা ও পানি ভালো ভাসতেন। বলতেন, ‘দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই। বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই।’ বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলেও তার আদর্শ চির অম্লান হোক। তিনি আরও বলেন, তার দেওয়া মন্ত্রগুলো ধারণ করলে তার দল এবং দেশ রক্ষা পাবে, অন্যথায় পাবে না। তার মৃত্যুতে আগামীর মৃত্যু হয়নি, বরং খালেদা জিয়া এবং তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।
খালেদা জিয়ার প্রতি স্মৃতিচারণা করে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশে মানুষ আজ স্বাধীনভাবে ঘৃণা ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারছে। এ জন্য এক নেত্রীর স্থান হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, আরেকজনের স্থান হয়েছে বিতাড়িত ভূমিতে।’
খালেদা জিয়ার দুটো অর্জন কেউ ভাঙতে পারবে না বলে উল্লেখ করেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রথমত, বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী তিনি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা পেয়েছেন।’
অনুষ্ঠানের সভাপতি সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম বেগম খালেদা জিয়া। তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ। ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়চেতা।’ এ সময় সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেগম খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি দেওয়ার দাবি জানান।
‘বাংলাদেশ ছাড়া আমার কোনো ঘর নেই’–খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্য উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সরকারের সময় অবকাঠামো উন্নয়ন, আইনের শাসন, বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার নীতি দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সাহায্য করেছে।’
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। একজন স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে তিনি আমার মন জয় করে নিয়েছেন। দেশকে ভালোবেসে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। খালেদা জিয়ার শেষ বাণী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান–আমরা সবাই যেন ধারণ করি।’
নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, ‘মানুষ ও রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার ছিল রুচিশীল পরিমিতিবোধ। বিশেষ করে যখন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা ও সংযমের ঘাটতি প্রকট, তখন নিজের ওপর ও তার পরিবারের ওপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আঘাত ও দুর্ভোগ নেমে এসেছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় তিনি কখনোই প্রকাশ্যে নিজের বেদনা, ক্ষোভ কিংবা নিন্দাসূচক কোনো বক্তব্য উচ্চারণ করেননি। এই বিষয়টি আজকের বাংলাদেশের অসহিষ্ণু সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।’
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’ (ইচ্ছাকৃত অবহেলা) হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে খালেদা জিয়ার লিভারের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এটা উনাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। খালেদা জিয়া ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড-১৯-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তারা (বর্তমান মেডিকেল বোর্ড) তার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেনও বলে জানান তিনি।
খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জন’ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন অনেকে করেন উল্লেখ করে এই চিকিৎসক বলেন, ‘‘আমার উত্তর হলো, মেথোট্রেক্সেট সেই ওষুধ, যেটা তার ফ্যাটি লিভার অসুখ বাড়িয়েছিল এবং সেটা লিভার সিরোসিসে নিয়ে গিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে এটা তার লিভারের জন্য ‘স্লো পয়জন’ ছিল।’’
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘জাতির এই সন্ধিক্ষণে যখন তার (খালেদা জিয়া) উপস্থিতি, পরামর্শ, দিক নির্দেশনা সম্ভবত সবচেয়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখনই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। উনি হয়ত চাইতেন আজকের এই চ্যালেঞ্জগুলো আমরা সবাই একত্রিতভাবে, নীতিনিষ্ঠভাবে দেশ ও মাতৃকার প্রতি ভালোবাসা থেকে যৌথভাবে মোকাবিলা করি।’
খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকবার্তা পাঠ করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন। সভায় আরও বক্তব্য দেন লেখক ফাহাম আবদুস সালাম, পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী দেবাশীষ রায়, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, ডিপিআইয়ের সভাপতি আবদুস সাত্তার দুলাল, সাবেক কূটনৈতিক আনোয়ার হাশিম, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ, লেখক ও গবেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান। এরপর খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে স্মরণসভা শেষ হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্মরণে আয়োজিত সভায় যোগ দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ সিনিয়র নেতারা। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ উপস্থিত ছিলেন। এতে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক, কূটনীতিক, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সম্পাদক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে অনুষ্ঠান শেষ হয়।



