আলোচিতজাতীয়সারাদেশ

ভোটের মাঠে ক্যামেরার চোখ, ভোটকেন্দ্র থাকবে সরাসরি পর্যবেক্ষণে

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে এবার বড় পরিসরে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পথে হাঁটছে নির্বাচন কমিশন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, এবার ২৫ হাজারের বেশি বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে, যার একটি বড় অংশ থেকে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৭৯টি। এর মধ্যে ২৫ হাজার কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের শরীরে বডি ক্যামেরা থাকবে। ভোট শুরুর আগমুহূর্ত থেকে শুরু করে ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রের ভেতর-বাইরের পরিস্থিতি, ভোটারদের আগমন, ব্যালট প্রদান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এসব ক্যামেরায় রেকর্ড হবে।

নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃহৎ পরিসরের একটি জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। বডি ক্যামেরার পাশাপাশি সিসিটিভি, ড্রোন ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার সমন্বিত প্রয়োগ এবারের নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করতে সহায়ক হবে। তবে একই সঙ্গে প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

বডিক্যাম বা বডি-ওর্ন ক্যামেরা আকারে ছোট হলেও কার্যকারিতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে থাকে লেন্স, ব্যাটারি, স্টোরেজ এবং রেকর্ডিং কন্ট্রোল। এটি সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত থাকে এবং সামনে যা ঘটে, সবকিছু ভিডিও আকারে ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রে অডিও রেকর্ডিংয়ের সুবিধাও থাকে। ক্যামেরা অন থাকলে আলাদাভাবে চালানোর প্রয়োজন হয় না; ব্যবহারকারীর চলাফেরার সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার দৃশ্যও পরিবর্তিত হয়।

ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে এসব ক্যামেরা থেকে কন্ট্রোল রুমে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি পরিস্থিতি দেখতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিতে পারেন।

বাংলাদেশ পুলিশের জন্য বডি ক্যামেরা নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ প্রথম পাইলট প্রকল্প হিসেবে বডি ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করে। পরে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল মহানগরসহ কয়েকটি জেলা পুলিশেও এটি সম্প্রসারিত হয়। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের সময়কার ভিডিও ফুটেজ থাকায় আইন লঙ্ঘনকারীরা অভিযোগ অস্বীকার করতে পারেন না, পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগও কমে আসে।

বডি ক্যামেরার বড় সুবিধা হলো—এটি নিরপেক্ষ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। সংঘর্ষ, অভিযোগ বা অপরাধসংক্রান্ত ঘটনার ভিডিও ফুটেজ আদালত ও অভ্যন্তরীণ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে। অনেক সময় শুধু ক্যামেরা চালু থাকার বিষয়টি জানার কারণেই মানুষ সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা থেকে বিরত থাকে। এতে সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য—উভয়ের নিরাপত্তাই বাড়ে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ব্যবহৃত ২৫ হাজারের বেশি বডি ক্যামেরার মধ্যে ১৫ হাজার ক্যামেরা অনলাইনে যুক্ত থাকবে এবং ১০ হাজার থাকবে অফলাইনে। অনলাইন ক্যামেরাগুলো থেকে লাইভ স্ট্রিমিং সম্ভব হবে। এজন্য একটি স্বতন্ত্র ও সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। কোনো কেন্দ্রের পরিস্থিতি অবনতি হলে ‘এসওএস’ সিগন্যালের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে লাইভ ভিডিও দেখা যাবে।

ভোটগ্রহণকালে পুলিশ সদর দপ্তরের কমান্ড সেন্টার থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।

বডি ক্যামেরার ভিডিও যাতে হ্যাকিং, ফাঁস বা বিকৃতির শিকার না হয়, সে জন্য শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনলাইন নেটওয়ার্কে সন্দেহজনক কোনো ট্রাফিক ধরা পড়লে অ্যালার্ট ও অটো ব্লকের ব্যবস্থা থাকবে। ভিডিও ব্যবহারে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন এবং প্রতিটি অ্যাকসেসের অডিট লগ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, যা মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করা যাবে না।

এদিকে দেশের প্রতিটি থানায় একটি করে ডকিং বা ডক স্টেশন স্থাপন করা হচ্ছে। এখান থেকে থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিজ নিজ এলাকার ভোটকেন্দ্রের বডি ক্যামেরা মনিটরিং করবেন। পাশাপাশি পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়েও আলাদা ডক স্টেশন থাকবে। সারা দেশে মোট ৭২০টি ইউজার প্ল্যাটফর্ম বসানো হচ্ছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন নজরুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ডিএমপির প্রতিটি থানায় ডক স্টেশন স্থাপন করা হচ্ছে, যেখান থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোয় থাকা বডি ক্যামেরার ব্যবহার তদারকি করা হবে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, কেন্দ্র দখল ও অনিয়ম ঠেকাতে এবার সিসিটিভি, ড্রোন এবং ২৫ হাজার ৭০০ বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এরপরও কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে ছাড় দেওয়া হবে না।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা বলেন, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে পুলিশ থেকে শুরু করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় পর্যন্ত লাইভ আপডেট থাকবে। সঠিক সমন্বয় হলে এই উদ্যোগ ভালো ফল দেবে বলে তিনি আশাবাদী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তিনি স্বাগত জানান। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ত্রুটিমুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত না হলে মানুষের আস্থায় চিড় ধরতে পারে। সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দেওয়া জরুরি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button