
নিজস্ব সংবাদদাতা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আটজন সাবেক শীর্ষ নেতা সংসদে জায়গা করে নিয়েছেন। একসময়ের রাজপথের সংগঠকরা এ বার পৌঁছে গিয়েছেন জাতীয় সংসদের সবুজ বেঞ্চে। তাঁদের মধ্যে ছ’জন ছিলেন ছাত্রদলের সভাপতি এবং দু’জন সাধারণ সম্পাদক।
এই আটজনের মধ্যে— পাঁচজন প্রথমবার সংসদে প্রবেশ করলেন, দু’জন তৃতীয়বার এবং একজন চতুর্থবারের জন্য নির্বাচিত হলেন।
রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা—দলীয় সরকারের নতুন মন্ত্রিসভায় এঁদের একাধিক মুখ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। বিশেষ করে যাঁদের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের পটভূমি রয়েছে, তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে দলীয় নেতৃত্ব।
মিলনের প্রত্যাবর্তন: আন্দোলন থেকে সংসদ—তৃতীয়বারের জয়
ছাত্র রাজনীতির গহ্বর থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে ফের একবার শক্ত উপস্থিতি জানালেন এ কে এম ফজলুল হক মিলন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত মিলন তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন।
গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ, গাজীপুর সদরের বাড়িয়া ও সিটি কর্পোরেশনের আংশিক) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লক্ষ ৩৩ হাজার ৮৬৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী খায়রুল আহসান পেয়েছেন ৭৮ হাজার ১২৩ ভোট।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সংগঠন সামলেছেন মিলন। সে সময় ছাত্র রাজনীতির উত্তাল অধ্যায়ে সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার কঠিন দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর অভিষেক হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে—যে সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন। পরে ২০০১ সালেও সংসদ সদস্য হন তিনি। সে সময় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনকালে নিজ এলাকায় তিনি বেশ কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন করেছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য অনিয়মের অভিযোগ নেই। ফলে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কারণে আসন্ন মন্ত্রিসভায় তার নাম গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
বর্তমানে তিনি গাজীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। এর আগে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও সামলেছেন।
দলীয় সূত্রের দাবি, মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয়তা, সংগঠন চালানোর অভিজ্ঞতা এবং পুরনো আন্দোলনের পটভূমির কারণে মিলনের নাম সম্ভাব্য মন্ত্রী তালিকায় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। নতুন সরকারের ক্ষেত্রে তাঁকে প্রশাসনিক বা সংগঠনিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে—এমন জল্পনাও চলছে।
আমানউল্লাহ আমান: চতুর্থবার সংসদে
ঢাকা-২ আসন থেকে চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আমানউল্লাহ আমান। তিনি পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬৩ হাজার ৭৯৩ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কর্নেল (অব.) আবদুল হক পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৩ ভোট।
নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা আমান ডাকসুর সাবেক ভিপি। ১৯৯০ সালে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতৃত্বে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯০-৯২ মেয়াদে ছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে তিনি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হন। পরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও সামলান। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর আবার মন্ত্রিসভায় ফেরার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিদের মধ্যে এবারের নির্বাচনে বিজয়ী তালিকার আরেক নাম শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। ১৯৯৬-৯৮ সাল মেয়াদে ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেওয়া এ্যানি লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসন থেকে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৬৫ ভোট পেয়ে এবার তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর রেজাউল করিম পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৯ ভোট।
এর আগে ২০০১ ও ২০০৮ সালেও লক্ষ্মীপুর সদর আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এ্যানি। ছাত্রদলের দাপুটে এই নেতা বিএনপির রাজনীতিতেও বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে দলের যুগ্ম মহাসচিব। এর আগে বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এ্যানি। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য সচিব, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সমন্বয়ক ও লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়কের মতো দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। এবারের মন্ত্রিসভায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে।
আজিজুল বারী হেলাল
ছাত্রদলের রাজনীতিতে আরেক আলোচিত নাম আজিজুল বারী হেলাল। বিএনপির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক তিনি। ২০০৩-০৪ সাল মেয়াদে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন।
এবার খুলনা-৪ আসন (রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া) থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন হেলাল। ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ১৬২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের এসএম সাখাওয়াত হোসাইন পেয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ৫৩০ ভোট। ছাত্ররাজনীতিতে দক্ষতার প্রমাণ দেওয়া আজিজুল বারী হেলাল কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু
টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসন থেকে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। জামায়াতের প্রার্থী আহছান হাবিব মাসুকে ৫০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০০৯-১২ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন তিনি। পরে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এবারের নির্বাচনে একটি মাত্র পরিবারের দুজন সদস্য একই জেলার দুটি আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সেই গর্বিত পরিবারের একজন হলেন টুকু। এবারের নির্বাচনে তার বড়ভাই বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম পিনটুও টাঙ্গাইল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১ লাখ ৩৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াত প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি তৃতীয়বারের মতো টাঙ্গাইল-২ আসন (গোপালপুর-ভূয়াপুর) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির এর আগের সরকারে শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পর টানা ১৭ বছর কারাবন্দি ছিলেন তিনি। এই সময়ে পিন্টুর আসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তার ছোটভাই টুকু। এবার মন্ত্রিসভায় দুই ভাইয়ের মধ্যে কেউ একজন থাকবেন বলে বিশ্বাস তাদের অনুসারীদের।
রাজীব আহসান
বরিশাল-৪ আসন (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-কাজিরহাট) থেকে এবার বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন রাজিব আহসান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট।
২০১৫-১৯ মেয়াদে ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন রাজিব। এখন তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক। বিগত সরকারের আমলে সারা দেশে তার বিরুদ্ধে ৩১২টি মামলা হয়। এর মধ্যে চার মামলায় তাকে সাড়ে আট বছরের সাজাও দেন আদালত।
আমিরুল ইসলাম খান আলিম
সিরাজগঞ্জ-৫ (চৌহালী-বেলকুচি-এনায়েতপুর) আসনে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিম। ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৯৭ ভোট পেয়েছেন তিনি।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আলী আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৮ ভোট। ২০০৯-১২ মেয়াদে সুলতান টুকুর সময়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আমিরুল ইসলাম আলিম। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন।
হাবিবুর রশিদ হাবিব
২০১২ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা হাবিবুর রশিদ হাবিব এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকা-৯ আসন (খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা) থেকে।
১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট পেয়ে আলোচিত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ও এনসিপির জাভেদ রাসিনকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন হাবিব। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এই আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ায় ক্লিন ইমেজের হাবিব তারেক রহমান মন্ত্রিসভায় জায়গা পাবেন বলে শোনা যাচ্ছে।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা একাধিক নেতা আবার সংসদে—এই সমীকরণ নতুন সরকারের চরিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নেতৃত্বকে সামনে রেখে বিএনপি সাংগঠনিক শক্তি ও আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে সরকার পরিচালনায় কাজে লাগাতে চাইছে বলেই মত পর্যবেক্ষকদের।
বিশেষত মিলন, আমান ও অ্যানির মতো পুরনো মুখদের নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভায় ‘ছাত্রদল বলয়’ তৈরি হতে পারে—এমন জল্পনাও রাজনৈতিক মহলে শোনা যাচ্ছে।
রাজপথের স্লোগান থেকে সংসদের বক্তৃতা—এই রূপান্তর শুধু ব্যক্তিগত উত্থানের গল্প নয়, বরং ছাত্র রাজনীতির একটি প্রজন্মের ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক দলিলও বটে।



